মেয়াদ পর্যন্ত থাকছেন শোভন-রাব্বানী

62

মেয়াদ শেষ করার সুযোগ পাচ্ছে ছাত্রলীগের চলতি কেন্দ্রীয় কমিটি। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হলেও নানা বিবেচনায় এ যাত্রায় বেঁচে যাচ্ছেন শোভন-রাব্বানী জুটি। তবে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের বিশেষ নজর থাকছে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে। ইতিবাচক ধারায় ফিরতে না পারলে যেকোনো সময় কপাল পুড়তে পারে ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার। এমন হুঁশিয়ারিতে সতর্ক ছাত্রলীগ। খোলা কাগজের সঙ্গে আলাপকালে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী নিজেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ‘যা রটে তা কিছু তো বটে’ মন্তব্য করে জানান, ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে চান ছাত্রলীগকে।

ছাত্রলীগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এবং কমিটি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশে নিমিষেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন প্রতাপশালী সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন শীর্ষ নেতাদের দরবারে। নানা মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। নিজেদের কর্মকাণ্ডে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি ভুল শুধরানোর প্রতিশ্রুতি দেন। শীর্ষ দুই নেতার ভুল স্বীকার করে নেওয়ায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শোভন-রাব্বানীকে।

শনিবার গণভবনে দলের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে কমিটি ভেঙে দিতে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা দুপুরের আগে ঘুম থেকে ওঠে না।’ এ সময় ওই বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ছাত্রলীগ নেতাদের বিভিন্ন নীতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ছাত্রলীগ সভাপতি ও সম্পাদকের জন্য অপেক্ষা করা, ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির পরে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পৌঁছানো, সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদকে প্রধান অতিথি করে আয়োজন করা ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে দুই শীর্ষ নেতার দেরিতে উপস্থিত হওয়া নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় দলের এক নেতা কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি করার বিষয়ে অনৈতিক অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ আনেন।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানো অভিযোগ নিয়ে ছাত্রলীগের একাংশ নাখোশ। তারা বলছেন সিনিয়র কিছু নেতার স্বার্থসিদ্ধি না হওয়ায় ছাত্রলীগের দুই নেতার নামে প্রধানমন্ত্রী বরাবর নালিশ করেছেন। শোভন-রাব্বানীর অনুসারীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে কমিটি করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দের প্রার্থীকে নেতা না বানানোয় ক্ষুব্ধ হয়েছেন বেশ কিছু নেতা। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে কমিটি করতে গিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশের বিরাগভাজনে পরিণত হয়েছেন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। তারই ফলস্বরূপ কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তোপের মুখে পড়তে হলো নেতৃত্বকে।

নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করছেন না সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। খোলা কাগজকে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমাদের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে তা অস্বীকার করব না। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং আপা (শেখ হাসিনা) যে প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন, সে প্রতিশ্রুতি পূরণে ইতিবাচক ধারার ছাত্রলীগ গড়ার চেষ্টা করব। আর সতর্ক থাকব যেন সমালোচনাকারীরা তাদের হাতে অস্ত্র না পায় সমালোচনা করার জন্য।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েকটি কারণে এ ধাপে বাঁচলেন শোভন-রাব্বানী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকা সত্ত্বেও আসনভিত্তিক ছাত্রলীগের নির্বাচনকালীন কমিটি করা, ২৮ বছর পরের ডাকসু নির্বাচনে ২৫ পদের ২৩ পদে ছাত্রলীগের প্যানেল বিজয়ী হওয়া, ধানের দাম নিয়ে কৃষকের অসন্তোষে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং বিভিন্ন সময় মানবিক আবেদনে সাড়া দেওয়ার মতো ঘটনা এ যাত্রায় রক্ষা করেছে শোভন-রাব্বানীকে। তাদের মতে, বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে বাধ্য হলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ হতো ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের। মেয়াদ শেষের আগে কমিটি ভেঙে দেওয়া হলে সমালোচনার মুখে পড়তে হতো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেও।

গত বছরের ১১ ও ১২ মে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিধান থাকলেও তা হয়নি। ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই সভাপতি হিসেবে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এর এক বছর পর চলতি বছরের ১৩ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে এ কমিটিতে স্থান পাওয়াদের নিয়েও শুরু হয় সমালোচনা। প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা আন্দোলন শুরু করেন। সে ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই অভিভাবক শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হলেন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা।

Facebook Comments