বাহাসমুখী রাজনীতি

37

শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল বিরোধী দল। বাংলাদেশের গণতন্ত্রে বিরোধীরা সঠিক দায়িত্ব পালন করছে কি-না দীর্ঘদিন ধরেই এ অমীমাংসিত বিতর্ক চালু রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে পরমতসহিষ্ণুতার অভাবে রাজনৈতিক বিরোধ অনেক সময়ই সংঘাতে রূপ নিতে দেখা গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল আট মাস পরে তা অনেকটাই কেটে গেছে। বরং, জাতীয় নানা বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের মধ্যে ইতিবাচক রাজনৈতিক বাহাসের একটি পরিবেশ দেখা যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পাল্টা বক্তব্য এবং বিএনপির সমালোচনার জবাব দিয়ে সরকারি দলের বক্তব্যে আশার আলো দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গঠনমূলক এসব বক্তব্যে পারস্পরিক সমালোচনা থাকলেও তাতে নেই উগ্র উত্তাপ। আছে যুক্তি, পাল্টা যুক্তি এবং যুক্তি খ-নের প্রবণতা। গণতান্ত্রিক বাতাবরণে এটাই হতে পারে সহায়ক শক্তি। গণতান্ত্রিক মন্দাবস্থায় এটাকে সুবাতাস হিসেবেই চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। গণতন্ত্র চর্চার জন্য পরস্পরের ভুল-ত্রুটি, আলোচনা-সমালোচনার বিকল্প নেই। বাহাসমুখী রাজনীতিতে উৎফুল্ল হওয়ার মতো বিষয়ও দেখছেন কেউ কেউ।

সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ খোলা কাগজের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের ভিত্তিই হচ্ছে পারস্পরিক সমঝোতা ও পারস্পরিক যোগাযোগ। রাজনৈতিক কাজকর্মের মধ্যে পারস্পরিক সহিষ্ণুতাই সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান। যে কোনো সভ্য দেশে এমনটি দেখা যায়। ব্রিটেনে দেখা যাবে, কেউ হয়তো খুব কঠিন ঝগড়া করছে আবার ঝগড়ার পাঁচ মিনিট পরেই তারা একত্রে চা পান করবে!

বিএনপিপন্থি এ বুদ্ধিজীবী বলেন, মুশকিলটা হলো, আমাদের মতো দেশে, বিশেষ করে যারা নতুন গণতান্ত্রিক সমাজে প্রবেশ করেছে; সেখানে সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। পারস্পরিক সদ্ব্যবহার একেবারেই অনুপস্থিত। সমঝোতার বিষয়টা ভয়ঙ্করভাবে অনুপস্থিত। গণতন্ত্রে এ সমস্যাগুলো রয়েছে। পরস্পরকে যদি দেখতেই না পারি, তার কথা সহ্য করতে না পারি, তার বক্তব্য যদি ভদ্রভাবে গ্রহণ করতে না পারি, তাহলে কোথায় গণতন্ত্র! বিরোধী পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করে সেই বক্তব্যের উত্তরটা যেন সুরুচিপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়, নইলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হয় না বলে মন্তব্য করেন ড. এমাজউদ্দীন আহমদ।

ঢাবির সাবেক ভিসি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যতক্ষণ পর্যন্ত না সমাজে ডেভেলপ করবে, সমঝোতার বিষয়টা যতদিন শক্তিশালী না হবে, সুরুচিসম্পন্ন মানসিকতা যতদিন পর্যন্ত ডেভেলপ না করবে, সহিষ্ণুতা যতদিন কার্যকর না হবে ততদিন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল নয়।

লেখক-বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) এ বিষয়ে খোলা কাগজকে বলেন, সরকার ও বিরোধী দল উভয় শ্রেণির রাজনৈতিক নেতাদের প্রধান কাজ জাতীয় সমস্যা ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলা। জনমত গঠন করা। প্রতিপক্ষের সমালোচনাও তাতে থাকে।

খ্যাতনামা এ সাংবাদিক আরও বলেন, আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। জাতীয় সমস্যা ও জনগণের সমস্যা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাই পরস্পরকেই যুক্তি দিয়ে সমালোচনা না করে আক্রমণ করে বক্তব্য দেন। এসব নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতি কুলক্ষণ। জনগণ এসব পছন্দ করে না। এর মধ্যে যখন দেখা যায়, নেতারা মোটামুটি সৌজন্য রক্ষা করে বক্তব্য দিচ্ছেন, তখন মানুষ মনে করে হয়তো তারা রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা ভালোর দিকে নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন। ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাইছেন। এটা ভালো লক্ষণ এবং জনগণ এটাকে সমর্থন করে বলে মন্তব্য করেন সৈয়দ আবুল মকসুদ।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক বাহাস প্রবণতা তুঙ্গে উঠেছে। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সমালোচনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পঁচাত্তরে জাতির পিতার হত্যার পর জিয়া ক্ষমতা দখল করেন। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এরশাদ প্রথমে মার্শাল ল’ জারি করেন। এরপর নিজেই ক্ষমতা দখল করে নেন। উচ্চ আদালত এ ক্ষমতা দখলকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। অবৈধ যখন ঘোষণা করেছেন, তখন আর এ দুজনের কেউ রাষ্ট্রপতি হিসেবে থাকেন না। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, তাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ?উল্লেখ করা বৈধ নয়। এটাই বাস্তবতা।’

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিত সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এরশাদের ক্ষমতা দখলে অখুশি ছিলেন না হাসিনা। সংসদে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) প্রায়ই অসত্য কথা বলেন… যে কথাগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। ইতিহাস তা সাক্ষ্য দেয় না। সত্য হচ্ছে এটাইÑ এরশাদ যখন জবরদখল করে ক্ষমতা দখল করে একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিয়ে, তখন তিনিই (শেখ হাসিনা) বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তের কাছে বলেছিলেন, উনি অখুশি নন এরশাদ আসাতে।’

অন্যদিকে ফখরুলের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন তথ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। গতকাল তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে মির্জা ফখরুলের এ ধরনের মন্তব্য রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। তার ক্রমাগত মিথ্যাচারের কারণে তাকে অনেকেই ‘মির্জা’ নয় ‘মিথ্যা ফখরুল’ বলেন। তিনি এমন মিথ্যাচার করেন, যা শুনতে পেলে গোয়েবলস্ও কবরে নড়ে উঠতেন।”

এর আগে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে উসকানি রয়েছে। এখন তারা রাজনীতিতে সংকটের ফাঁদে পড়ে আবোলতাবোল বকছে। দুই বছর ধরে মিয়ানমার সীমান্তে বারবার উসকানি দিয়েছে। আমাদের নেত্রী বারবার সতর্ক করেছেন, এদের ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমার সরকারের মতো বিএনপিও সেই উসকানি দিচ্ছে।’

এ ইস্যুতে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, ‘মিয়ানমারের ফাঁদে পড়েছে সরকার। কয়েক দিন ধরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাহেবকে মনে হচ্ছে তিনি খুব বিব্রত, কিছুটা বলা যেতে পারে ভারসাম্যহীন অবস্থা হয়ে গেছেন। ওবায়দুল কাদের বলছেন, রোহিঙ্গাদের সমস্যা নাকি আমরা করেছি। কী বলবেন? হাসিও পায় তার কথা শুনে।’

অন্যদিকে এ ইস্যুতে ‘দলবাজি’ না করে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, ‘এই প্রশ্নে কোনো রাজনীতি নয়, এই প্রশ্নে কোনো দলবাজি নয়। সরকারকে সবাই সাহায্য করুন। রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে অনুরোধ করব, ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের সহযোগিতা করুন। এখানে আমরা দলবাজি করতে চাই না।’
ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ‘বোমাসদৃশ’ বস্তু পাওয়া নিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তথ্যমন্ত্রী অবিরল মিথ্যাচার করছেন। বোমাসদৃশ বোতল উদ্ধারের পেছনে ওপর মহলের নীলনকশা রয়েছে।’

রিজভীর এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পেট্রলবোমার সঙ্গে বিএনপির কর্মীরা বেশ পরিচিত। বিএসএমএমইউয়ের প্রশাসনিক ভবনে পাওয়া বোমাসদৃশ বস্তুর সঙ্গে বিএনপির যোগসাজশ আছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।’

দুর্নীতির অভিযোগে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, ‘অবিলম্বে খালেদার মুক্তি এবং গণতন্ত্রকে মুক্ত করবার জন্যে একটি নির্বাচন চাই। এ নির্বাচন হবে সম্পূর্ণভাবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ। আমরা বলেছি এ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে হবে। এ দুটি দাবিতে আন্দোলন করছি এবং আন্দোলন আরও বেগবান হবে।’

ফখরুলের বক্তব্যের সমালোচনা করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মির্জা ফখরুল অক্টোবর মাস থেকে আন্দোলন শুরু করবেন বলেছেন; এটা কোন বছরের অক্টোবর? এটি অনেকে প্রশ্ন রেখেছে। ওনারা তো এভাবে ১০ বছর ধরে বলে আসছেন, ঈদের পরে আন্দোলন, শীতের পরে আন্দোলন, গরম একটু পড়লে… কমলে আন্দোলন, বৃষ্টি একটু কমে গেলে আন্দোলন, বার্ষিক পরীক্ষার পরে আন্দোলন।’

আগামী ৩০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে রংপুর-৩ আসনে উপ-নির্বাচন। এরশাদের মৃত্যুর পর শূন্য হওয়া এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল তিনি বলেন, ‘আমরা রংপুর সদর ৩ আসনের উপ-নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। এর মাধ্যমে দেশের মানুষকে দেখাতে চাই এ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচন কতটা খারাপ। সেকারণেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। এ সরকারের ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে বলে মনে করি না। তার ওপর আবার ইভিএমের মাধ্যমে নির্বাচন, ফলে ঘাপলা করার যথেষ্ট সুযোগ তারা তৈরি করে রেখেছে।’

Facebook Comments