বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্থান

65

রনি রেজা

একাত্তরের ৭মার্চে যে মানুষটির ভাষণ শুনতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষ হাজির হয়েছিল তার জনপ্রিয়তা ছিল কতটা উঁচুতে? কিংবা যার ডাকে সাড়া দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালি ঝাপিয়ে পড়লো হিংস্র পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি বাঙালির কতখানি ভরসার জায়গা দখল করেছিলেন? একাত্তর ও বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে এমন অসংখ্য প্রশ্ন আসতেই থাকবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানই বা এত সাহস, এত শক্তি কোথা থেকে পেলেন? প্রত্যন্ত একটি গ্রামে বেড়ে ওঠা ছেলে কিভাবে পারলেন পুরো জাতিকে এক করতে? অসংখ্য সম্ভাবনার ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কেন এলেন রাজনীতির অমসৃণ পথে? কবে থেকে এলেন এ পথ মাড়াতে? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে সামনে এলো এম আর আকতার মুকুলের একটি কথা। তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছিলেন, ১৯৬৩সালে ন্যাপ – ভাসানীর সভাপতি হিসাবে মাওলানা ভাসানী পাকিস্তান সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে গনচীন সফর করেন।মাও সেতুং এশীয় কুটনীতির স্বার্থে আইয়ুব খানের বিরোধিতা না করার জন্য অনুরোধ করেন।মাওলানা ভাসানী তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।তখন মাওলানা ভাসানীর প্রগতিশীল গোষ্টীর মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মহলের চিন্তাধারার মধ্যে বিস্তর ফারাক হয়ে গেল। এই ৬০এর দশক হচ্ছে একজন সার্থক রাজনৈতিক নেতা হিসাবে শেখ মুজিবের উত্থানকাল।তার বুকে তখন অদম্য সাহস ও মনোবল।পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রকে দেখলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার নেতৃত্বের মেধার আলো ছড়িয়ে সব বাঙালির মনে জায়গা করে নিয়েছিল।জাতির জনকের মাঝে মেধা ও আলো ছিল বলে বাঙালির মানসপটে স্হায়ী জায়গা বানাতে সক্ষম হয়।’

বঙ্গবন্ধুর রজনৈতিক জীবন ঘেটে পাওয়া যায়, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন উর্দুকে পাকিস্থানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু তার তৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেন। একইবছর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট আহবানকালে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। পরে ১৫ মার্চ কারাগার থেকে মুক্তিপান। ওইবছর ১১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য বঙ্গবন্ধু আবার গ্রেফতার হন। ১৯৪৯ ২১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তিপান। ১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের দাবি দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মঘট ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু তার প্রতি সমর্থন জানান। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি এই আন্দোলনের কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫২ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলা রাষ্ট্র ভাষার দাবীতে বঙ্গবন্ধু কারাগারে অনশন শুরু করেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ মিছিলে গুলি চলে। শহীদ হন সালাম, রফিক, বরক সহ অনেকে। জেল থেকে বঙ্গবন্ধু এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন এবং একটানা ৩ দিন অব্যাহত রাখেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি টানা অনশনে অসুস্থ বঙ্গবন্ধুকে স্বাস্থ্যগত কারণে মুক্তিদেয়া হয়। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে সব বিরোধী দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। ১৯৫৪ সালে ১০ মার্চ সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে বিজয়ী হয়। বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জের আসনে বিজয়ী হন। ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভায় বয়ঃকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন ধর্ম নিরপেক্ষতা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দ প্রত্যাহার করে নতুন নামকরণ করা হয় ‘আওয়ামী লীগ’ বঙ্গবন্ধু পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবত করা হয়। ১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিুর রহমানের নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধি ‘দাঙ্গা প্রতিরোধ’ কমিটি গঠিত হয়। ১৯৬৮ সালের ২৮ জানুয়ারি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতে লিখিত বিবৃতি দেন। এই বিবৃতি পড়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও তার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দালন গণ অভুঙ্খানে রূপ নেয়। ছাত্র সমাজ ছয় দফার সমর্থনে ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ডাকসু এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে এক বিশাল সম্বর্ধনা দেয়ার আয়োজন করে। ওই সভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু বেতার ও টেলিভিশনে নির্বাচনী ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়েই আওয়ামী লীগের জন্ম। তার সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই আওয়ামী লীগের বিকাশ’। তিনি দেশবাসীর কাছে ছয় দফার পক্ষে ম্যান্ডেট চান।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর বন্যা-দুর্গত এলাকা বাদে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পায় ৮৮টি আসন। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সকল নির্বাচিত সদস্য ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন তথা ৬ দফা বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করেন। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ এই রবীন্দ্র সংগীতের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে বাঙালি জাতির মুক্তির সংকল্প ব্যক্ত করেন। শপথ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সংগীতের পর ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। গানটি পরিবেশিত হয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক শুরু হয় হোটেল পূর্বানীতে। ওইদিনই আকস্মিকভাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনিদিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। সারা বাংলা ক্ষোভে ফেটে পরে। বিক্ষুদ্ধ জনসমুদ্রে পরিণত হয় রাজপথ। বঙ্গবন্ধু এটাকে শাসকদের আরেকটি চক্রান্ত বলে চিহ্নিত করেন। তিনি ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহবান করেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক যুগান্তকারী ভাষনে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষনে স্পষ্ট হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যত। সারাদেশে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব অসযোগ আন্দোলন।

Facebook Comments