প্রত্যাবাসনের তোড়-জোড়ে ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর অনিশ্চয়তা

35

প্রত্যাবাসনের তোড়-জোড়ে প্রায় চাপা পড়ে গেলো আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচর প্রকল্প। সম্পূর্ণ প্রস্তুত করার পরও রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহে বৃহৎ এ প্রকল্পে স্থানান্তর এখনও শুরু করা যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে তাদের রাজি করানো হবে। তবে এ বিষয়ে আর তেমন কোনও উদ্যোগ নিতে দেখা যায় নি। এখন তোড়-জোড় চলছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে।

মিয়ানমার সামরিক জান্তার জ্বালাও-পোড়াও, উৎপীড়ন, নিপীড়ন, হত্যা, গুম ও গণগ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাত্র সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে সম্মত হয়েছিলো দেশটি। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাউথইস্ট উইং এবং মন্ত্রণালয়ের রোহিঙ্গা সেলের কর্মকর্তাদের দৌড়-ঝাঁপ শুরু হয়েছিলো। তাদের ফেরত পাঠাতে নেয়া হয় নানা উদ্যোগ। গত ২২ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) থেকে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা ছিলো। তবে শেষমেষ তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহে এ উদ্যোগ কাজে আসে নি।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে দফায় দফায় আলোচনা করে মাত্র সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর তোড়-জোড়ে বলা যায় অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার রোহিঙ্গা স্থানান্তর ভাসানচর প্রকল্পের বিষয়টি। যেখানে প্রথম ধাপেই ১ লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করার কথা ছিলো। পরবর্তীতে আশ্রয় নেয়া বাকি রোহিঙ্গাদেরও পুনর্বাসন করা সম্ভব হতো। তবে নোয়াখালীর এই ভাসানচর প্রকল্পেও যেতে অনাগ্রহ ছিলো রোহিঙ্গাদের। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে সে সময় জানান হয়, অনাগ্রহের বিষয়টি নিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে স্থানান্তর করা হবে। এরপর আর এ বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নিতে দেখা যায় নি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাউথইস্ট উইং এবং মন্ত্রণালয়ের রোহিঙ্গা সেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রোহিঙ্গা সেলের মহাপরিচালক (ডিজি) দেলোয়ার হোসেন দৈনিক জাগরণকে বলেন, ভাসানচরে স্থানান্তর প্রক্রিয়া যে একেবারেই থেমে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে তা কিন্তু নয়। সব ধরনের প্রক্রিয়াই চলমান রয়েছে।

তখনও আলোচনায় এসেছিলো কিছু এনজিও কর্মকর্তারা এ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের নিরুৎসাহিত করছে, তখন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানানো হয়েছিলো। এই দীর্ঘ সময়েও কেন ব্যবস্থা নেয়া হলো না— এমন প্রশ্নের জবাবে ডিজি বলেন, পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এটা দৃশ্যমান না হওয়ায় আপনারা জানতে পারছেন না। সব ধরনের প্রক্রিয়ায়ই অব্যাহত রয়েছে।

ভাসানচর প্রকল্পে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর থমকে যাওয়ার পর দৈনিক জাগরণকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছিলেন, ‘বিষয়টিতে তারা মোটেই হতাশ নন। অনিশ্চয়তা কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে উদ্যোগ নেয়া হবে।’

রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নোয়াখালীর ভাসানচর প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। ১৫ এপ্রিল (সোমবার) থেকে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নিতে কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিলো। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য ভাসানচরে পুলিশ ক্যাম্প, নৌ বাহিনীর একটি দফতর ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সব সদস্যদের জন্য আবাসন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর জন্য ১ হাজার ৪৪০টি ব্যারাক হাউস, ১২০টি গুচ্ছ গ্রাম, ১২০টি সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া সুপেয় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, পুকুর খনন, স্কুল ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আয়ের পথ সৃষ্টি করতে ছোট দোকান, বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনার পাশাপাশি মহিষ, হাঁস-মুরগি পালন, কুটিরশিল্প, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছচাষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে দু’টি হেলিপ্যাড।

Facebook Comments