পোস্টমর্টেম কেন আর কীভাবে করা হয়?

59

অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় মৃতদেহ বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর কারণ জানার যে চেষ্টা করা হয়, তাকেই পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত বলা হয়। পোস্টমর্টেম শব্দটি অটোপসি, নিক্রোপসি ইত্যাদি দ্বারাও বোঝানো হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর কয়েক শ ময়নাতদন্ত হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে আলাদা আলাদাভাবে সেটি হওয়ায় এর মোট সংখ্যাটি কারো জানা নেই। খবর বিবিসি বাংলার।

পোস্টমর্টেম কেন করা হয়?

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা: মমতাজ আরা বলেন, মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত করা হয়। কোনো ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে বা তার মৃত্যু নিয়ে কোন সন্দেহ তৈরি হলে, মৃত্যুর সঠিক কারণটি জানার জন্য মৃতদেহের পোস্টমর্টেম করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে মৃতদেহ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা হয়, ঠিক কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক সময় শরীরের ভেতরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখা হয়। যেমন ধর্ষণের অভিযোগে সিমেন সংগ্রহ করে ডিএনএ ম্যাচ করা হতে পারে। আবার আত্মহত্যার মতো অভিযোগে ভিসেরা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বোঝা যায় যে বিষপ্রয়োগের কোন ঘটনা ঘটেছে কীনা।

অনেক সময় কোন ব্যক্তি অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করার পরেও যদি ওই মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে তখন যে পোস্টমর্টেম করা হয়, তাকে বলা হয় ক্লিনিক্যাল পোস্টমর্টেম।

ময়নাতদন্ত নাম কীভাবে এলো?

অটোপসি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ অটোপসিয়া থেকে। যার অর্থ মৃতদেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার করার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা।

ডা: মমতাজ আরা জানিয়েছেন, ময়না শব্দটি ফার্সি বা উর্দু থেকে এসেছে, যার অর্থ ভালো করে খোঁজা বা অনুসন্ধান করা। ফলে ময়নাতদন্ত মানে হলো ভালো করে তদন্ত করে দেখা। যেহেতু মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা এই কাজটি করে থাকেন, এ কারণেই এর নাম হয়েছে ময়নাতদন্ত।

কীভাবে ময়নাতদন্ত করা হয়

হত্যা, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনার মতো যেকোনো অপমৃত্যু বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত করা হয়ে থাকে। এ ধরনের ঘটনায় প্রথমেই পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। অর্থাৎ মৃতদেহ কী অবস্থায় পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এরপর মৃত্যু সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য ময়নাতদন্ত করতে পাঠানো হয়।

মর্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা সেই সুরতহাল প্রতিবেদন দেখে, প্রথমে মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থার বিশ্লেষণ করেন। সেখানে কোন আঘাত বা ক্ষত আছে কিনা, ত্বক ও জিহ্বার রঙ ইত্যাদি দেখে প্রথম প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

এরপরে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভারসহ শরীরের ভেতরটা যাচাই করে দেখা হয়। ফলে শরীরের ভেতরে কোন আঘাত থাকলে, রক্তক্ষরণ বা বিষক্রিয়া থাকলে, সেটি চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন। কোথাও আঘাতের চিহ্ন থাকলে সেটি কীভাবে হয়েছে, তা ভালো করে যাচাই করা হয়। এই কাজটি করতে গিয়ে মৃতদেহের নানা অংশ কেটে দেখতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। এ সময় শরীরের নানা প্রত্যঙ্গও সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়ে থাকে।

ময়নাতদন্ত শেষে মৃতদেহ আবার সেলাই করে আগের মতো অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। তবে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোন কোন অংশ কেটে আরো পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হতে পারে।

ময়নাতদন্ত থেকে কী জানা যায়?

ময়নাতদন্তে বেশ কয়েকটি বিষয় জানার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি বিষয় হলো মৃত্যু কীভাবে হয়েছে এবং কখন মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিনা, আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে কিনা, বিষ খাওয়ানো হয়েছে কিনা, রক্তক্ষরণের কোন ঘটনা আছে কিনা- ইত্যাদি বিষয়ও ময়নাতদন্তে বেরিয়ে আসে।

কোন মৃত্যুর ময়নাতদন্ত করা হয়?

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, কোন মৃত্যুর ঘটনাগুলোয় ময়নাতদন্ত করা হবে।

তিনি জানান, হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনায় মৃত্যু, বিষপানে মৃত্যু, শরীরের যদি কোন আঘাতের দাগ থাকে, অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি বলে সন্দেহের অবকাশ থাকলেই সেখানে মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পোস্টমর্টেম করতে হবে।

এ ধরনের ঘটনায় প্রথমে পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। অর্থাৎ পুলিশ কর্মকর্তা কী অবস্থায় মৃতদেহটি দেখেছেন, মৃতদেহের বিস্তারিত বর্ণনা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এরপর থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়রির পরে পুলিশ মৃতদেহটি ময়নাতদন্ত করার জন্য পাঠিয়ে থাকে। তবে, পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হলে একজন ম্যাজিস্ট্রেট সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। এরপর মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

ময়না তদন্ত কোথায় হয়?

বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজে মর্গ রয়েছে। সেখানে ময়নাতদন্তের জন্য বিশেষ স্থান থাকে। সেখানে ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা ময়নাতদন্ত করে থাকেন। এর বাইরে যেসব জেলা শহরে আড়াইশো শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে, সেখানে ময়নাতদন্ত করা হয়ে থাকে। মেডিকেল কলেজগুলোয় ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপকরা ময়না তদন্ত করলেও, জেলা শহরে সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে আবাসিক সার্জনরা সেটা করে থাকেন।

অধ্যাপক ডা. মমতাজ আরা বলছেন, যত দ্রুত ময়নাতদন্ত করা যাবে, তত ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। তবে অনেক সময় মৃত্যুর অনেক পরেও, দাফন হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ সময় পরেও পুনরায় ময়নাতদন্তের উদাহরণ রয়েছে।

ময়নাতদন্তের প্রকারভেদ

মৃত্যুর কারণ জানার জন্য মূলত ময়নাতদন্ত করা হলেও এর আরো কয়েকটি ভাগ রয়েছে।

যেমন-

মেডিকেল: অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ জানতে এই ময়নাতদন্ত করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি একটি প্রচলিত পদ্ধতি।

একাডেমিক: চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করা হয়ে থাকে।
ক্লিনিক্যাল: অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুর পরেও কারো মৃত্যু নিয়ে যদি বিতর্ক তৈরি হয়, তখন ক্লিনিক্যাল পোস্টমর্টেম করা হয়।

ময়নাতদন্তের ব্যতিক্রম

অনেক সময় অস্বাভাবিক মৃত্যু হলেও পরিবারের স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াও মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়ে থাকে।

পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদুর রহমান বলেন, বাস দুর্ঘটনার মতো অনেক অস্বাভাবিক মৃত্যুর মতো ঘটনায় যখন মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকে না, তখন পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়ে থাকে। কারণ পরিবারের সদস্যরা চান না, তাদের স্বজনদের মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করা হোক। তখন ম্যাজিস্টেটের অনুমতি নিয়ে মৃতদেহ হস্তান্তর করা হতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে অবশ্যই ময়নাতদন্ত করা হবে।

ময়নাতদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

সম্প্রতি পুলিশ বেশ কয়েকটি হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ময়নাতদন্তের ভুল দেখতে পেয়েছে।

এ বিষয়ে ডা: মমতাজ আরা বলেন, আমার বিশ্বাস, কোন চিকিৎসক পক্ষাবলম্বনের জন্য ভুল প্রতিবেদন তৈরি করেন না। হয়তো অনেকদিন পরে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে, ফলে সঠিক চিত্রটি বেরিয়ে আসেনি। কিন্তু ইচ্ছা করে কেউ এটা করেছেন বলে আমি মনে করি না।

ময়নাতদন্তের ইতিহাস

সহকারী অধ্যাপক ডা: মমতাজ আরা জানান, সতের শ শতক থেকেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর পোস্টমর্টেমের রীতি চালু রয়েছে। তবে তখনকার তুলনায় এখন অনেক আধুনিকভাবে ময়নাতদন্ত করা হয়ে থাকে।

Facebook Comments