পাল্টায়নি কেমিক্যাল গুদামের চিত্র

42

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসন থেকে শুরু করে পুরান ঢাকাবাসীর টনক নড়লেও বাস্তবতায় ফলাফল শূন্য। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে ফের রাসায়নিক দাহ্যবস্তু বাসা-বাড়িতেই মজুদ করে রাখছে। বিন্দুমাত্র রাসায়নিক গুদাম কোথাও সরেনি। যা ফের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই গুদামজাত রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ ও কারখানাগুলো শনাক্ত করে দ্রুত সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরেজমিন দেখা যায়, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় যে ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল এর পাশের ভবনে নতুন করে গড়ে উঠেছে কেমিক্যাল ব্যবসা। বস্তাবন্দি কেমিক্যাল, প্ল্যাস্টিকের দানার চলছে রমরমা ব্যবসা। শুধু চুড়িহাট্টায় নয়, পুরান ঢাকার লালবাগ, মিটফোর্ড, আরমারিটোলায় কেমিক্যাল ও পারফিউমের গুদাম রয়েছে। সহজে বোঝার উপায় নেই যে, সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। মিটফোর্ডের মমতাজ মার্কেট, আহছান মার্কেট, মাহমুদা ম্যানশন, ইমাম কমপ্লেক্স, মিটফোর্ড টাওয়ার, হাজী ইউসুফ ম্যানশন, রিয়াজ মার্কেট, জনি ম্যানশন, মোনা কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন মার্কেটে কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক দোকান রয়েছে। আরমানিটোলা ও বাবুবাজারেও রয়েছে অসংখ্য কেমিক্যালের দোকান ও গোডাউন। এছাড়া চকবাজার, বেগম বাজার, নাজিমুদ্দিন রোড, বেচারাম দেউরী, আবুল হাসনাত রোডসহ আশপাশের এলাকার অনেক আবাসিক ভবনে রয়েছে পারফিউম বডি-স্প্রেসহ বিভিন্ন কসমেটিকস আইটেমের কেমিক্যালের গোডাউন। রয়েছে কেমিক্যাল মিশ্রিত প্লাস্টিক দানা ও প্লাস্টিক সরঞ্জাম তৈরির কেমিক্যালের গুদামও। কেমিক্যাল, প্লাস্টিকের গুদাম, পারফিউমের কারখানা সরানো নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এমনকী সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে এলাকাবাসী শিক্ষা নেয়নি, সচেতনও হয়নি। বরং কিছুদিন পর ভুলে গিয়ে সেই আগের মতোই চলছে ব্যবসা।

চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরই বাসা-বাড়িতে রাখা কেমিক্যাল ও প্ল্যাস্টিকের গুদামের বিরুদ্ধে কয়েকদিন অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। তখন ডিএসসিসি ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের হোসেনি দালান এবং নাজিম উদ্দিন রোডের ৯৮/১, ৯৮/২, ৯৮/৩, ৯৮/৪, ৯৮/১/সি, ৯৮/১/এ এবং হোসেনি দালানের ৯৮/২ বাড়িতে পলিথিন প্লাস্টিকের গোডাউন পাওয়ায় পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের মালিটোলার ৩০/৩১, ৬৯/১, ৭৯, ৭৪/১, ৪৬ এবং ২৬ নম্বর বাসার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। একইভাবে ২২ নম্বর ওয়ার্ডের ৩৪/বি, ৩৪/এ/২, হাজারীবাগের ১৮০ নম্বর হোল্ডিং ভাগলপুরের ১৩৫/১ এবং নিলাম্বর সাহা রোডের ৪০/৪০/১ নম্বর হোল্ডিংয়ের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। কয়েকদিন যেতে না যেতেই এসব বাসা-বাড়িতে ফের ইউটিলিটি সার্ভিস সংযোগ দেয়া হয়।

চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ড ভবনের পাশেই খান প্ল্যাস্টিক দানার দোকানে বসে আছেন ইয়াসিন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব দাহ্য পদার্থ চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো বস্তাবন্দি অবস্থায় রাখা হয়। সেখানে কোনটি অতিদাহ্য পদার্থ সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন না। শুধু কেমিক্যাল ক্রেতা-বিক্রেতারাই বুঝতে পারবেন। ২৯টি কেমিক্যাল নিষিদ্ধ করার পর সেগুলো প্রকাশ্যে বিক্রি কমেছে। তবে আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা সেগুলো বিক্রি না করলেও গোপনে অনেক ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী দেদার এসবের ব্যবসা করে যাচ্ছে। তবে আমরাও চাই ক্ষতিকর ও দাহ্য কেমিক্যাল বিক্রি বন্ধ হোক।

মিডফোর্ড রোডে কেমিক্যাল পারফিউমের দোকানের মালিকের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। ওই ব্যবসায়ী বলেন, চুড়িহাট্টায় আগুন ছড়িয়েছে সিলিন্ডারে কিন্তু সেটি দোষারোপ করেছে কেমিক্যালকে। সাংবাদিকদের কারণেই ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সরকার ২৯টি কেমিক্যালের ব্যবসা করতে নিষিদ্ধ করেছে পুরান ঢাকায়। সেগুলো হলো- অ্যাসিটোনে, বুটিল অ্যাসিটেড, এন বুটিল অ্যাসিটেড, এন বুটানল, ডিল-২৫৭৫, সাইক্লোহেক্সিনন, ইথাইল অ্যাসিটেড, ইথাইল অ্যাসিটেড (অ্যানডিন্যাচারাল অ্যালকোহল), ইথানল (অ্যাবসুলেট এইচপিসিএল জেআর.), ইথানল (অ্যাবসুলেট), ২-ইথাইল অ্যালকোহাল, ইথাইল গেলকোল, হেবি অ্যানোমেটিক, আইএসও- প্রোপল অ্যালকোহাল (টিচ. জিআর.), আইএসও- প্রোপল অ্যালকোহাল (ফার-র ম্যাটেরিয়ালস), আইএসও- প্রোপল অ্যালকোহাল, মিথানল, মেক, এমআইবিকে, অর্গানিক কোম্পাজিট সলভেন্ট এন্ড থিনার, এন-প্রোপল অ্যাসিটেড, ২-প্রোপানল, ১.২ প্রোপানডাল, রিডিউচার, সলভেন্ট বেস প্রোভাইডিং ইন্ক এন্ড ডিটেন্ট, টলিউইন্, থিনার-বি, জাইলিন, ডাই-অ্যাসিটোন অ্যালকোহাল।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান আমার সংবাদকে বলেন, পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল ও প্লাস্টিকের গোডাউন স্থানান্তরে সরকারকে বড় ধরনের ভূমিকা রাখাতে হবে। নামেমাত্র সরকার ব্যবসায়ীদের প্লট বরাদ্দ দিলে গোডাউন স্থানান্তর হবে কিন্তু ব্যবসা পুরান ঢাকায় থেকে যাবে। এতে দুই দিকে পরিবেশের ক্ষতি হবে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল পারফিউম মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন মাসুদ আমার সংবাদকে বলেন, ভারত-পাকিস্তান দেশ বিভাগের পরই কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা পুরান ঢাকায় বিন্দু বিন্দু করে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। সরকার হঠাৎ করে ব্যবসা অন্যত্র স্থানান্তরের কথা বললেই হবে না। আমরা কেমিক্যাল গোডাউনের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত জমি নেবো কিন্তু ব্যবসা পুরান ঢাকায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সহ-সভাপতি কে এম ইকবাল হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, চুড়িহাট্টায় যে ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেখানে প্ল্যাস্টিকের কিছুই ছিল না। ভবনের নিচে হোটেল, উপরে গোডাউন। কিন্তু বাঙালি প্লাস্টিক কোনটা সেটাই তো চেনে না? তবে প্ল্যাস্টিকের র-ম্যাটারিয়ালের দোকান দুই-তিনটি ছিল। আগুন লাগলে ওটা (প্লাস্টিক) তো জ্বলবেই। উদাহরণ স্বরূপ- ঘরে আগুন লাগলে ফার্নিচার সবই তো পুড়ে যাবে। তাই হয়েছে চুড়িহাট্টায়। ওখানে যানজট, সিএনজি ও সিলিন্ডারের গাড়ি থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। সব দোষ প্লাস্টিকের ওপর দেবে সেটি মগের মুল্লুক নাকি?

তিনি আরও বলেন, বনানীর মতো জায়গায় ভবনে আগুন লেগে মানুষ মারা গেছে। সেটিও কি প্লাস্টিক করেছে? এজন্য ঘটনা ঘটার আগেই সরকারকে দায়িত্বশীল হয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। মিস ম্যানেজম্যান্ট আমাদের দেশে। পৃথিবীতে যে দেশ যত উন্নত হচ্ছে সেই দেশে তত প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। প্লাস্টিক একটি সহায়ক ইন্ড্রাস্টিজ। প্রসঙ্গত, পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ৭১ জন নিহত হয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে আগুনের কারণ হিসেবে কেমিক্যালকেই দায়ী করা হয়েছে।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments