দেওয়ালবন্দি শিশুর জীবন!

34

১০ বছরের রাহুল। রাজধানীতেই তার বেড়ে ওঠা। মাঠে খেলতে ভীষণ পছন্দ করে সে। কিন্তু রাহুলের বাবা-মা কোনোভাবেই ছেলেকে মাঠে খেলতে দিতে চান না। কারণ ছেলে বেশি চঞ্চল। রাহুলের মা রিমি বলেন, মাঠে খেলতে গেলেই সে কপাল ফাটিয়ে আসে, কখনো পায়ে ব্যথা পায়, নয়তো আঙুল থেঁতলে আসে। আর এসব শারীরিক অসুস্থতার কারণে দু-চার দিন স্কুল-কোচিংও বাদ পড়ে। এতে রাহুল ক্লাসে পিছিয়ে পড়ে। তাই রাহুলকে ট্যাব কিনে দেয়া হয়েছে। সে এখন ট্যাব ও কম্পিউটারে বাসায় বসেই বিভিন্ন ধরনের গেমস খেলে, মাঠে যাওয়া তার একেবারে বন্ধ।

এ চিত্র কেবল রাজধানীর নয়, সারাদেশে একই অবস্থা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা খেলার ভেতর দিয়েই শিখবে। খেলাধুলার মধ্য দিয়েই শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটবে। মানুষের সঙ্গে শিশুরা মিশতে শিখবে; এতে তাদের সামাজিক দক্ষতা বাড়বে, কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটবে। অথচ শহরের স্কুল ও পাড়ায় খেলার মাঠ না থাকায় এবং নিরাপত্তার অভাবে শিশুদের মাঠে খেলাধুলা প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে শিশুরা চার দেওয়ালে বন্দি হয়ে পড়ছে এবং স্ক্রিনে আটকে গেছে তাদের দৃষ্টি। খেলাধুলা ও অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় অনেকে মুটিয়ে যাচ্ছে এবং নানা ধরনের অসুস্থতায় পড়ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা জানান, ‘জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ’-এর ধারা ৩১-এ বলা আছে, ‘খেলাধুলা শিশুর অধিকার।’ তবে ‘জাতীয় শিশুনীতি-২০১১’ অনুযায়ী, শিশুর খেলা ও বিনোদনের অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। শিশুদের খেলাধুলার অধিকার নিশ্চিত করতে দায়িত্ব রয়েছে আমাদের প্রত্যেকেরই।

রাজধানীর একজন অভিভাবক এনামুল হক বলেন, ‘বাইরে বাচ্চাকে একা ছাড়তে নিরাপদ বোধ করি না। তাছাড়া আমরা যে সময় দেব, ব্যস্ততার কারণে তা-ও পারি না। তাই সন্তানকে নিরাপদে বাসায় রেখে বিনোদনের ব্যবস্থা হিসেবে ট্যাব ও কম্পিউটার দিয়েছি। কারণ এখন সময়টা আগের মতো নয় যে বাচ্চা একা বাইরে খেলে ফিরে আসবে। কিংবা বাসার পাশেই মাঠ নেই যে সেখানে খেলে ঘরে ফিরে আসবে। মাঠ আছে, সেটা বাসা থেকে দূরে। তাই সন্তানের বাইরে খেলাই বন্ধ রেখেছি।’

সেভ দ্য চিলড্রেন ২০১৮ সালে ‘শিশুদের খেলাধুলার অধিকার’ বিষয়ে যে গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা গেছে :“ঢাকা শহরের শিশুরা বলছে, তারা খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না। ৪৭ শতাংশ শিশু মনে করে এর কারণ পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ। ‘ভ্যালু অব প্লে’ শীর্ষক ওই রিপোর্টের তথ্যমতে, ৯২ শতাংশ শিশু মনে করে খেলার ছলে তারা আরো ভালোভাবে শিখতে পারে। ৯৮ শতাংশ অভিভাবকও মানেন, খেলার মধ্য দিয়ে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে।

এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, শিশুদের বিনোদনের দরকার আছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মোবাইল ফোন আসক্তিকে একটি রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম’-এর পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন ইত্তেফাককে বলেন, যাদের ছোটো বাচ্চা আছে এমন একটা পরিবার যখন বাসা খোঁজে, তখন দেখে যে বাসার চারপাশে ভালো স্কুল আছে কি না। কিন্তু খুব কম অভিভাবক আছেন, যারা বাসা নেওয়ার সময় ভাবেন যে বাসার আশপাশে খেলার মাঠ আছে কি না।

Facebook Comments