ড্রেসিংরুম যখন লোকাল বাস

45

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বছরখানেক আগে, কণ্ঠশিল্পী মমতাজের একটি গান প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। গানে গানে মমতাজ বলেছিলেন, ‘বন্ধু তুই লোকাল বাস, আদর কইরা ঘরে তুলোস ঘাড় ধইরা নামাস।’ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমের দরজাও যেন এখন সেই লোকাল বাসের মতোই হাঁ করে খোলা! কখন কে দলে আসছেন, কখন কে বাদ পড়ছেন, কেনই বা সুযোগ পাচ্ছেন আর কী কারণে বাদ পড়ছেন—কোনো কিছুরই নেই গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা।

গত বছরের গোড়ার দিকে, নাঈম হাসান অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলছিলেন নিউজিল্যান্ডে। তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনা হয় দেশে, নেওয়া হয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্টের দলে। অথচ তড়িঘড়ি করে উড়িয়ে আনা ওই অফস্পিনারকে কিন্তু সেই সিরিজে সুযোগ দেয়নি টিম ম্যানেজমেন্ট। কেন তাহলে বিশ্বকাপের মাঝপথে ফিরিয়ে আনা? ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে চোট পাওয়ায় টেস্ট অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের বিকল্প হিসেবে ওই সিরিজে নির্বাচকদের মনে পড়ে অভিজ্ঞ বাঁহাতি স্পিনার আব্দুর রাজ্জাকের কথা। যদিও চট্টগ্রামে সিরিজের প্রথম সেই টেস্টে খেলা হয়নি রাজ্জাকের, বরং অভিষেক হয় আরেক বাঁহাতি স্পিনার সানজামুল ইসলামের। ম্যাচ শুরুর আগে রাজ্জাকের কাছ থেকেই টেস্ট ক্যাপ পাওয়া সানজামুল এখন কোথায়? এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও সম্প্রতি দল নির্বাচন নিয়ে অস্থিরতায় যা খুব নিয়মিত ব্যাপার হয়ে উঠেছে। বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে শুরু করে চলতি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট পর্যন্ত অনেকের দলে থাকা এবং না খেলেই বাদ পড়ার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা কখনোই দিতে পারেননি নির্বাচকরা।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমের দরজাও যেন এখন সেই লোকাল বাসের মতোই হাঁ করে খোলা! কখন কে দলে আসছেন, কখন কে বাদ পড়ছেন, কেনই বা সুযোগ পাচ্ছেন আর কী কারণে বাদ পড়ছেন—কোনো কিছুরই নেই গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা।

আয়ারল্যান্ডে যাওয়া ইয়াসির রাব্বি ও ফরহাদ রেজারা খেলার সুযোগ পাননি। বিশ্বকাপ দলে তখনো কোনো ওয়ানডে না খেলা আবু জায়েদ রাহীর অন্তর্ভুক্তিও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। আয়ারল্যান্ড সিরিজ চলার সময়ও বিশ্বকাপের দলে পরিবর্তনের সুযোগ থাকায় নির্বাচকরা তাসকিন আহমেদকেও আয়ারল্যান্ড সফরে নিলেন। তিনি প্রস্তুতি ম্যাচে খরুচে বোলিং করায় নির্বাচকরা আর চাইলেন না তাঁর দিকে। ওদিকে রাহী বিশ্বকাপের ঠিক আগেভাগে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ৫ উইকেট পেয়ে ধরে রাখেন জায়গা। অথচ বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচেই তাঁর কথা বিবেচনা করেনি টিম ম্যানেজমেন্ট, কার্যত বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াড হয়ে পড়ে ১৪ জনের।

শ্রীলঙ্কায় তিন ওয়ানডের সিরিজের দলেই জায়গা হয়নি আবু জায়েদের, ঢুকে যান ফরহাদ রেজা ও তাসকিন। একাদশে সুযোগ মেলেনি অবশ্য। তবে সব ছাড়িয়ে গেছে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে! নতুন হেড কোচ রাসেল ডোমিঙ্গো নাকি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে দেখতে চাইছেন, এই ধুয়া তুলে ড্রেসিংরুমে নির্বাচকরা একাধিক খেলোয়াড় ঢোকাচ্ছেন আর বের করে দিচ্ছেন।

সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচের জন্য ঘোষিত দলে চমক ছিলেন তাইজুল ইসলাম, আফিফ হোসেন, ইয়াসিন আরাফাত ও মেহেদী হাসান। তাইজুল ও আফিফ একাদশে জায়গা পেলেন এবং টিকে গেলেন। মেহেদী কোনো ম্যাচ না খেলেই বাদ! চোটে পড়া ইয়াসিনের বদলি আবু হায়দারের ভাগ্যও মেহেদীর মতোই। পরের দুই ম্যাচের জন্য আমিনুল ইসলাম বিপ্লব ও নাজমুল হোসেন শান্তর মতো তরুণদের দলভুক্ত করার পাশাপাশি ফেরানো হয়েছে এক দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রুবেল হোসেন ও শফিউল ইসলামকে। তাঁরাও বিশেষ কিছু করে দলে ফেরেননি।

সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ দল নির্বাচন নিয়ে এমন অস্থিরতাকে দেখছেন ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়’ হিসেবে। যেখানে দল নির্বাচনে বিসিবি সভাপতির হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর প্রশ্ন, ‘তাহলে দলটা কে ঠিক করে?’ দল নির্বাচনে অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণেই দায়িত্ব ছাড়া ফারুক মনে করেন, পরিস্থিতি এখনো বদলায়নি। তবে ত্রিদেশীয় সিরিজের দল নির্বাচনে যে হাইপারফরম্যান্স (এইচপি) দলের হেড কোচ সায়মন হেলমটও অন্যতম ‘নির্বাচক’ ছিলেন, সেটি লেগস্পিনার হিসেবে আমিনুলকে দলে নেওয়ার সুপারিশেই স্পষ্ট। এখানে নির্বাচকদের সমস্যাও তুলে ধরতে চেয়েছেন ফারুক, ‘দল যখন ভালো করে, তখন সবাই-ই কৃতিত্ব নিতে চায়। খারাপ করলে দায়িত্ব নিতে চায় না কেউই। যদি এই অচলাবস্থার সমাধান না হয়, তাহলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য খুব ভালো হবে না ব্যাপারটি।’ দল গঠনের অস্থিরতা যে খেলোয়াড়দের মনোজগতেও প্রভাব ফেলে, সেটি স্পষ্ট মোসাদ্দেক হোসেনের কথায়ও, ‘দলে যখন বদল আসে, তখন পারফরম না করতে পারলে সময়টা কঠিন হয়ে ওঠে।’

তাই বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সের গাড়িটাও চলছে লোকাল বাসের মতোই ধুঁকে ধুঁকে। কখনো দাঁড়িয়ে পড়ছে অনির্ধারিত স্থানে, সেই সুযোগে ক্রমেই ব্যবধান কমিয়ে আনছে পেছনের প্রতিযোগীরা। অগ্রবর্তী দলও এগিয়ে যাচ্ছে বহুদূর!

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments