ট্রাফিক সার্জেন্টদের নামে চলছে অবৈধ সিএনজি-অটোরিকশা

30

পুলিশের ট্রাফিক সার্জেন্টদের নামে রাজধানীতে চলছে হাজার হাজার অবৈধ অটোরিকশা। আবার অবৈধ এসব সিএনজি অটোরিকশার বডিতে প্রাইভেট গাড়ি লেখা থাকলেও তা ভাড়ায় চালানো হচ্ছে।

গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ এলাকা থেকে ঢাকা এনে চালানো হচ্ছে এসব গাড়ি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের চারটি ট্রাফিক ডিভিশনের ডিসিদের নামে সিএনজি অটোরিকশাগুলো চলানো হচ্ছে। প্রতিটি এলাকায় নির্ধারিত দালালদের মাধ্যমে প্রতিমাসে ‘মান্থলি’ দিয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভাড়ায় চালানো হচ্ছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনুমোদানহীন, বাতিল ও একই নম্বরের একাধিক সিএনজি অটোরিকশা খোদ ট্রাফিক সার্জেন্টদের নামে চলছে। প্রতি গাড়িতে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক দাবি করা সার্জেন্টের মোবাইল নম্বর দেওয়া রয়েছ। নগরীর ৪টি গার্ডে ৫শ টাকা করে ২ হাজার টাকা দিয়ে দিনভর চলছে এসব গাড়ি। অজ্ঞাত কারণে অবৈধ এই সিএনজিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। এ জন্য সাধারণ সিএনজি ব্যবসায়ীরা গাড়ি চালানোর জন্য চালক পাচ্ছেন না।

আবার রাজধানীর অনেক ট্রাফিক সার্জেন্টের নামে ১০ থেকে ২০টি সিএনজি অটোরিকশা চালানো হচ্ছে। এসব সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশার মালিক হলেও তার নামে ঢাকার বাইরে থেকে চোরাই, বাতিল করা এবং একই নম্বরের ১৫ থেকে ২০টি গাড়ি চালানো হচ্ছে।

আবার কখনো কখনো নিজেদের ইচ্ছেমতো নম্বর লাগিয়েও চালাচ্ছেন চালকরা। রাজধানীর গুলিস্তান, শাহবাগ, চানখারপুল, আজিমপুর, নিউমার্কেট এলাকায় সরেজমিন খোঁজ নিয়ে এবং সিএনজি অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএমপির প্রত্যেক ট্রাফিক ডিভিশনে অবৈধ এসব সিএনজি চালানোর জন্য ৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা ‘মান্থলি’ দিতে হয়।

আর এসব টাকা বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বরত সার্জেন্ট ও টিআইগণ নির্ধারিত দালালদের মাধ্যমে আদায় করে থাকে। এর মধ্যে বাড্ডা এলাকার দালাল জুয়েল। তিনি প্রতিটি প্রাইভেট ঘোষণার সিএনজি অটোরিকশার জন্য ৬ হাজার টাকা করে আদায় করেন।

এরপর ট্রাফিকের পূর্ব ডিভিশনের সার্জেন্টদের মাধ্যমে চাঁদা পরিশোধ করা হয়। রাজধানীর বাইরের অর্থাৎ ঢাকা জেলার প্রায় ৮ হাজার সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে চালানো হচ্ছে। এসব গাড়িতে ঢাকা-থ, লেখা রয়েছে।

মাসুম নামে এক সিএনজিচালক জানান, ঢাকা মেট্রো-দ ১৪-০৬-০৫ গাড়িটি কদমতলী থানার এক দারোগার গাড়ি তিনি চালান। গাড়িটি ঢাকা জেলার। তার আরও কয়েকটি গাড়ি রয়েছে।

রায়েরবাজার এলাকার সেলিম নামের এক দালাল ঢাকা জেলার গাড়িগুলো প্রবেশের জন্য ৪ হাজার টাকা করে ‘মান্থলি’ আদায় করছেন। আবার বেশকিছু গাড়ি বিভিন্ন সার্জেন্টের নামেও চালানো হচ্ছে। ঢাকা মেট্রো-দ-১১-০০৫৯ নম্বরের প্রাইভেট লেখা গাড়িটির জন্য প্রতিমাসে ৬ হাজার টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে বলে গাড়ির চালক জানিয়েছেন।

অপর সূত্র জানায়, ডিজিটাল নম্বর প্লেট নকল করে একই নম্বরের গাড়ি বিভিন্ন রুটে চালানো হচ্ছে। একই নম্বর প্লেট হওয়ায় প্রকৃত দামের প্রায় অর্ধেকেরও কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে সার্জেন্টদের কাছে। নকল নম্বর প্লেট ও অটোরিকশা তৈরি করারও একটি সিন্ডিকেট রয়েছে গড়ে উঠেছে। ঢাকা-থ নামের যেসব নম্বর প্লেট রয়েছে তা ঢাকা মহানগরে চলাচলের অনুমতি নেই। আর ঢাকা মেট্রো-থ এর নম্বরগুলো বেশি নকল করা হচ্ছে। এই নম্বরের গাড়িগুলো ২০১৮ সালে প্রতিস্থাপন করা হয়। পুরনো নম্বর ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে সার্জেন্টদের নামে। রাজধানীতে চারটি রুটে চলছে এসব অটোরিকশা।

সিএনজি অটোরিকশাচালকরা জানান, রাস্তায় অটোরিকশা বের করলে নানা অযুহাতে তাদের মামলা জরিমানা দিয়ে নাজেহাল করেন সার্জেন্টরা। একপর্যায়ে তারা অটোরিকশা চালাতে অনীহা প্রকাশ করেন। আর এ সুযোগে সার্জেন্টরাই ওই চালককে প্রস্তাব দেন তাদের গাড়ি চালাতে। এতে কোনো মামলা বা জরিমানা করবে না তারা। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক চালক সার্জেন্টদের গাড়ি চালাচ্ছেন। যেসব রোডে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসে ওই রোডে দায়িত্বরত সার্জেন্টরা আগে থেকেই তাদের নির্দিষ্ট অটোরিকশাকে রোড ব্যবহারের জন্য নিষেধ করেন।

আবার পুরনো গাড়ি মোরামত করে সার্জেন্টদের কাছে বিক্রি করে দালাদের মধ্যে মোহাম্মদপুরের নাছিম, সাকিল, সেলিম, কাশেম, শাহীন, কালু ও কালু ফাতরা। আর মিরপুর কালশী রোডের জনি ও রেজোয়ান। আর মিরপুর মাজার রোডের রানা, হারুন ও ফরিদ। মগবাজার এলাকায় ইমরান খন্দকার ও নান্টু। যাত্রাবাড়ীর জুরাইন এলাকায় আলামিন ও শাহীন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল জানান, রাজধানীতে সার্জেন্টদের নামে ১০ থেকে ১৫টি সিএনজি অটোরিকশা চালানো হচ্ছে। এসব সার্জেন্টের মধ্যে সুমন, সাদ্দাম, মোকারম, ছামছুর, মোস্তফা, আলামিন, মালেক, রেজাউল, কিশোর, জনি, মেহেদি, মাওলা, রাছেল, সুকুমার, মোমিন, আহাদ, জাহিরুল, অজুদ, সাইফুল, ওয়ারলেস অপরেটর মালেকসহ আরও অনেকে।

ঢামেক হাসপাতালে মানিক নামের এক সিএনজিচালক জানান, তার গাড়িটি ট্রাফিক পশ্চিম ডিভিশনের ডিসির বডিগার্ডের গাড়ি। আগে তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন, সেখান থেকে চাকরি চলে যাওয়া এখন সিএনজি অটোরিকশা চালাচ্ছেন।

বিআরটিএর সূত্র জানায়, ‘ঢাকা মেট্রো-দ’ নামের যেসব নম্বর প্লেট ব্যবহার করে প্রাইভেট হিসেবে রাস্তায় চলছে এগুলোর মধ্যে ১১-০২৩৯, ১১-০২১০, ১১-০১৮৬, ১১-০১৫০, ১১-০১১২, ১১-০৪০২, ১১-০৪০১ থেকে ৬ পর্যন্ত সিরিয়ালের কোনো অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন নেই। তার পরও সার্জেন্টদের নামে এসব সিএনজি অটোরিকশা চালানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে শাহবাগ জোনের ট্রাফিক সার্জেন্ট আতাউর অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা চলাচলের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সিএনজি অটোরিকশা চালকরা রোগী বহনের নামসহ বিভিন্ন অজুহাতে রাজধানীতে অবৈধভাবে চালিয়ে আসছে। তবে মাঝে মধ্যে এদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর অনেক সিএনজি অটোরিকশা আটকের পর ডাম্পিংয়ে পাঠানো হচ্ছে। আর কিছু কিছু অটোরিকশায় অসুস্থ রোগী বহন করায় মানবিক কারণে তা ছাড় দেওয়া হয়ে থাকে বলে জানান তিনি।

Facebook Comments