চোরাই বিদ্যুতে ইজিবাইকের রমরমা ব্যবসা

45

চোরাই বিদ্যুতে রমরমা ব্যবসা করছে ইজিবাইক ও অটোরিকশার মালিকরা। এর ফলে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে অবৈধভাবে এসব বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে্। শুধু ঢাকায় নয় সারাদেশে বিদ্যুৎ চুরির কৌশল একই রকম। আবার বাণিজ্যিক বিলের জায়গায় আসছে আবাসিক বিল। এটির জন্য সহযোগিতা করছে মিটার রিডার ও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, রাজধানীর প্রায় সব জায়গায় চলছে অবৈধ অটোরিকশা ও ইজিবাইক। এর মধ্যে শুধু রাজধানী উত্তর সিটি কর্পোরেশনে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। যাদের বেশির ভাগই অবৈধ ভাবে নেয়া লাইনের মাধ্যমে চার্জ দেয়া হয়।

পরিচয় গোপন রেখে কথা হয় রাজধানী তুরাগ এলাকার গ্যারেজ মালিক সাগরের সঙ্গে। তিনি বলেন, দিনে শুধু হালকা চার্জ দেয়া হয় বৈধ ভাবে। আর সারারাত যেসব গাড়িগুলোতে চার্জ দেয়া হয় সেগুলো চোরাই লাইনের মাধ্যমে দেয়া হয়। ডেসকো কর্তৃপক্ষ কোন ঝামেলা করে না? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না। কেনো করবে। মাসিক একটা টাকার বিনিময়ে আমাদের তো তাদের সঙ্গে মৌখিক অনুমতি নেয়া আছে।

গ্যারেজ মালিক সাগর আরো বলেন, যদি কখনো উপর থেকে স্যারেরা অভিযানে আসেন তখন যারা আমাদের থেকে টাকা নেয় তারা আগে থেকেই বলে দেয়। তখন অবৈধ তারগুলো পোল থেকে খুলে ফেলি।

অপর একটি গ্যারেজের ম্যানেজার মাহিন আলম অবৈধ চার্জ লাইন সম্পর্কে বলেন, ভাই এটা দেখে সবাই বোঝে, চোরাই লাইন দিয়ে সব গ্যারেজে অটোরিকশায় চার্জ দেয়া হয়। শুধু রাতের অপেক্ষায় থাকে গ্যারেজ মালিকরা, কখন রাত হবে।

কি পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হয় এবং তার মূল্য কেমন হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিটি গ্যারেজ লাখ লাখ টাকার বিল ফাঁকি দিচ্ছে। ডেসকোর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লাখ লাখ টাকার বিল ফাঁকি দিয়ে আমাদের কাছ থেকে মাসে নিচ্ছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। যার পুরোটাই যাচ্ছে ডেসকোর এসব অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে। আর সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব।

এ বিষয়ে অটোরিকশা ও ইজিবাইক মালিকরা জানান, প্রতি গাড়ি চার্জ বাবদ প্রতিদিন ১৫০টাকা করে দিতে হয় গ্যারেজ মালিকদের। একদিন বাকি পড়লে নানা কথা শুনতে হয়। তবে এটার একটা সুবিধা রয়েছে। যেখানে আমার গাড়িতে বৈধ ভাবে চার্জ দিতে গেলে মাসে বিল আসবে প্রায় ১০ হাজার টাকার বেশি, সেখানে মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকায় পুরো মাসে চার্জ দেয়া যায়।

কত টাকা গাড়ি থেকে চার্জ বাবদ আসে একটি সমীকরণ নিতে গিয়ে দেখা যায়, যদি একটি গ্যারেজে অটোরিকশা ও ইজিবাইক থাকে ১০০টি তাহলে চার্জ বাবদ প্রতিদিন আসে ১৫ হাজার টাকা। সপ্তাহে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫ হাজার, আর মাসে ৩১ লাখ ৫০ হাজার। বছর শেষে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

গ্যারেজ মালিক সোহানুর রহমান। তিনি প্রায় চার বছর ধরে গ্যারেজ পরিচালনা করে আসছেন। তার গ্যারেজে সব সময় ৪০ থেকে ৫০টি গাড়ি থাকে। প্রতিদিন সব মিলিয়ে প্রায় ১শ’ গাড়ি থাকে। সব খরচ বাদ দিয়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা মাসে লাভ হয় তার। বৈধ বিদ্যুৎ বিল ও নানা খরচ বাদ দিয়ে এই পরিমাণ টাকা আয় করেন তিনি। আর অবৈধ চার্জ বাবদ কি পরিমাণ টাকা ডেসকো কোম্পানির লোকদের দিতে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাই এইটা আপনার জানার দরকার নেই। বিষয়টা আমাদের গোপন ব্যাপার।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজধানী তুরাগের একটি গ্যারেজ মালিক জুয়েল মিয়া তার গ্যারেজে প্রায় ৬০টি গাড়ি চার্জ দিচ্ছেন। প্রথমে তাকে না পাওয়া গেলে কথা হয় গ্যারেজে থাকা একজনের সঙ্গে। বিলের কাগজ দেখতে চাওয়া হলে তিনি দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে মালিক জুয়েলকে মুঠোফোনে কল দিয়ে ডাকা হলে তিনি আবাসিক বিলের কাগজ নিয়ে আসেন। এই বিলের কাগজ বাণিজ্যিক না হয়ে আবাসিক কেনো জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

এ বিষয়ে জানতে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহিদ সারোয়ারের কাছে গেলে তিনি বলেন, আসলে এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই, তবে এটি উড়িয়ে দিচ্ছি না। আমি তথ্য নিয়ে দেখব যদি কেউ জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোন অন্যায়কারীকে ছাড় দেয়া হবে না।

Facebook Comments