চট্টগ্রামে কিশোরদের হাতে চোরাই মোটরসাইকেল!

67

চট্টগ্রামে কিশোরদের হাতে হাতে চোরাই মোটরসাইকেল। বিক্রি হয় অবৈধ মার্কেটে। যেখানে তিন লাখ টাকার মোটরসাইকেল দেড় লাখ টাকায়, দুই লাখ ২০ হাজার টাকার মোটরসাইকেল বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০ হাজার টাকায়। এক লাখ আশি হাজার টাকার মোটরসাইকেল মাত্র ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রয় হচ্ছে।

সিটিজি সেল অ্যান্ড বাই, সিটিজি বাই অ্যান্ড সেল নামে দুটি ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি হচ্ছে এসব চোরাই মোটরসাইকেল। কিশোর গ্যাংয়ের চোরচক্র এসব অবৈধ মার্কেট প্লেসের এডমিন। এ ছাড়া ম্যান টু ম্যানও বিক্রয় হচ্ছে এসব মোটরসাইকেল।

এরমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা থেকে চুরি করা মোটরসাইকেল যেমন রয়েছে তেমনি চোরাই পথে ভারত থেকে নিয়ে আসা মোটরসাইকেলও রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে চুরি করা অনেক মোটরসাইকেল আবার চোরাই পথে ভারত কিংবা মিয়ানমারেও চলে যাচ্ছে।
কখনো আবার সীমান্তে কড়াকড়ি দেখা দিলে মোটরসাইকেলগুলোর যন্ত্রাংশ খুলে দোকানে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। চুরি থেকে বিক্রি পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ড মেনে চলতে হয়। চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী নির্দিষ্ট ব্যক্তির শরণাপন্ন না হলে মোটরসাইকেলের খোঁজ মিলে না।

এমন তথ্য মিলেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. কামরুজ্জামানের কাছ থেকে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তারকৃত মোটরসাইকেল চোরচক্রের সদস্যদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য জানা গেছে।

কিশোর গ্যাংয়ের চোরচক্রের নয়টি গ্রুপ পৃথকভাবে মোটরসাইকেল চুরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যারা দুই মিনিটেই একেকটি মোটরসাইকেল চুরির কাজে পারঙ্গম।
পুুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, চুরি ঠেকাতে বিশেষ অভিযান চলার ফাঁকেও প্রতিদিন নগরীতে তিন-চারটি মোটরসাইকেল চুরি হচ্ছে। চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। প্রত্যেকের কাজ ভাগ করা আছে। মোটরসাইকেল চুরি করা থেকে বিক্রি করা পর্যন্ত পাঁচ স্তরে ভাগ হয়ে তারা এ কাজ করে।

তিনি বলেন, চোরচক্র ম্যান টু ম্যান এসব মোটরসাইকেল বিক্রি করে। ফলে চোরচক্রের আসা-যাওয়া ও গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখছে পুলিশ। এ ছাড়া সিটিজি বাই অ্যান্ড সেল এবং সিটিজি সেল অ্যান্ড বাই নামক ফেসবুক পেজ, বিক্রয় ডটকমসহ সকল অনলাইন মার্কেটের ওপরও নজর রাখছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতদের দেয়া তথ্যমতে, চোরচক্র মোটরসাইকেল চুরি করতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায় এবং বিভিন্ন মোটরসাইকেল আরোহীকে টার্গেট করে। টার্গেট করা ব্যক্তি তার মোটরসাইকেল থেকে নামার পর তাদের একজন ওই আরোহীর পিছু নেন আর অপরজন রাস্তায় বা পার্কিং করে রাখা মোটরসাইকেলের উপর বসে পত্রিকা পড়ার ভান করে বিশেষ চাবি দিয়ে লক খুলে সেটি নিয়ে পালিয়ে যান। চোরচক্র চোরাই মোটরসাইকেলগুলোর নম্বর প্লেটে অনটেস্ট বা প্রেস অথবা সাংবাদিক স্টিকার লাগিয়ে দেন।
কখনো কখনো রাস্তায় ঘোরাফেরা করার সময় সুবিধাজনক কোনো স্থানে মোটরসাইকেল দেখলে তা চাপ দিয়ে স্টিয়ারিং ভেঙে দেন। সেখান থেকে বের হওয়া তার দিয়ে তা চালু করে পালিয়ে যান। এভাবে একটি মোটরসাইকেল চুরি করতে তাদের মাত্র দেড় থেকে দুই মিনিট সময় লাগে। আগে টার্গেট করে মোটরসাইকেল চুরি করতেন তারা। কিন্তু এখন পথ চলতে রাস্তায় মোটরসাইকেল দেখলেই তা চুরি করেন।

সূত্র জানায়, গত ১৭ই আগস্ট নগরীর পাহাড়তলী থানাধীন ভেলুয়ার দীঘির উত্তর পাড় ইঞ্জিনিয়ার কলোনিতে অভিযান চালিয়ে মোটরসাইকেল চোরচক্রের দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পাহাড়তলী থানার ওসি মো. মঈনুর রহমান জানান, কলোনির ই/বি ১০ নম্বর বাসার ভেতর বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের হেফাজতে থাকা ২টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

এর আগে গত ২৭শে জুলাই মোটরসাইকেল চোরচক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং চারটি মোটরসাইকেল ও চুরি করার বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে পাহাড়তলী থানা পুলিশ। ওসি মঈনুর রহমান বলেন, টানা দু’দিন অভিযান চালিয়ে চার কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাহাড়তলী ও সীতাকুণ্ড থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

এর আগে বাঁশখালী থেকে ইলিয়াছ নামে একজন এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান থেকে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সিএমপি’র তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত নগরীতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শতাধিক মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা অনেক বেশি বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। অভিযোগ রয়েছে, মোটরসাইকেল চুরি হওয়ার পর থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ চুরি সমপর্কিত জিডি নেয় না। হারানো গিয়েছে লিখলেই জিডি নেয়া হয়। কিন্তু এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাকলিয়া থানার ওসি মো. নেজাম উদ্দিন।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল হারানো বা চুরি যাওয়ার পর মোটরসাইকেলের মালিক পুলিশকে অবহিত না করে নিজের মতো খুঁজতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ করে। এতে চোর মোটরসাইকেল নিয়ে নগরীর বাইরে চলে যান। তিনি আরো বলেন, অন্য থানার বিষয় তো আমি বলতে পারবো না, তবে আমাদের এখানে কেউ মোটরসাইকেল চুরি সংক্রান্ত অভিযোগ করতে এলে আমরা উল্টো তাদের মামলা করার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকি।

Facebook Comments