কোরবানির পশু জবাইয়ের নিয়ম

43

পশু নিবেদন বা জবেহ করা হবে এক আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে, যার কোনো শরিক নেই। আল্লাহ তায়ালা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য।

পবিত্র কোরআনুল কারিমে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ

‘আমি জিন ও মানুষকে এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা শুধু আমার ইবাদত করবে।’ (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)।

আরো পড়ুন>>> কোরবানি বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তগুলো

ইবাদত বলা হয়, ‘যেসকল কথা ও কাজ আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন; হোক সে কাজ প্রকাশ্যে বা গোপনে।’ (ফাতহুল মাজিদ, পৃ. ১৭)

আর এ ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার উদ্দেশ্যে পশু যবেহ করা। এ কাজটি তিনি শুধু তাঁর উদ্দেশ্যে করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ

‘বলো, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের রব আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তার কোকো শরিক নেই। আর আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।’ (সূরা-আনয়াম, আয়াত: ১৬২-১৬৩।

নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবাই করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে জবাই করেছেন। আর জবাই করা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম।

তাই প্রত্যেকের নিজের কোরবানি নিজে জবেহ করার চেষ্টা করা উচিত। এমনকি মহিলারাও কোরবানির পশু জবাই করতে পারে। সাহাবি আবু মুসা আশয়ারি (রা.) নিজের মেয়েদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন নিজ হাতে নিজেদের কোরবানির পশু জবাই করেন।’ (আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১০/১৯)। তার এ নির্দেশ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মেয়েরা কোরবানির পশু জবাই করতে পারেন। তবে অন্যকে দিয়ে জবাই করানোও জায়েয। (মুসলিম, আসসাহিহ : ১২১৮)।

জবাই করার সময় যে বিষয়গুলো লক্ষণীয়:

১. পশুর প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করা। এমন ব্যবস্থা নিয়ে জবাই করা, যাতে পশুর অধিক কষ্ট না হয় এবং সহজেই প্রাণ ত্যাগ করতে পারে। খুব তীক্ষ্ম ধারালো ছুরি দ্বারা জবাই করা। সাহাবি শাদ্দাদ ইবনু আউস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সকল বিষয়ে সকলের সঙ্গে সুন্দর ও কল্যাণকর আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, তোমরা যখন হত্যা করবে তখন সুন্দরভাবে করবে আর যখন জবাই করবে তখনো তা সুন্দরভাবে করবে। তোমরা ছুরি ধারালো করে নেবে, যেন খুব সহজেই জবাই হয়ে যায়। (মুসলিম, আসসাহিহ : ১৯৫৫)। বধ্য পশুর সামনেই ছুরি শান দেয়া উচিত নয়। (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৩১৭২)। একইভাবে, একটি পশুকে অন্য একটি পশুর সামনে যবেহ করা এবং ছেচরে যবেহ স্থানে টেনে নিয়ে যাওয়াও মাকরুহ।

২. কোরবানির পশু যদি উট হয় (অথবা এমন কোনো পশু হয় যাকে আয়ত্ব করা সম্ভব নয়) তাহলে তাকে বাম পা বাধা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে নহর করা হবে। (সূরা: হজ, আয়াত: ৩৬)।

যদি উট ছাড়া অন্যপশু হয় তাহলে তা বাম কাতে শোয়াবস্থায় যবেহ করা হবে। যেহেতু তা সহজ এবং ডান কাতে ছুরি নিয়ে বাম হাত দ্বারা মাথায় চাপ দিয়ে ধরতে সুবিধা হবে। সম্ভব হলে পশুকে ডানকাতে শুইয়ে জবাই করার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে পশুকে আরাম দেয়াই উদ্দেশ্যে। পশুর গর্দানের এক প্রান্তে পা রেখে জবাই করা মুস্তাহাব। যাতে পশুকে অনায়াসে কাবু করা যায়। কিন্তু গর্দানের পিছনদিকে পা মুচড়ে ধরা বৈধ নয়। কারণ, তাতে পশু অধিক কষ্ট পায়।

৩. জবাইকালে পশুকে কিবলামুখী করে শয়ন করানো উচিত। অন্যমুখে শুইয়েও জবাই করা শুদ্ধ হবে। (ইবনু উসাইমিন, আহকামুল উযহিয়্যাহ, পৃ. ৮৮-৯৫)।

৪. জবাই করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে। কারণ, এটা বলা ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسْمُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ

‘যার ওপর আল্লাহর নাম (বিসমিল্লাহ) উচ্চারণ করা হয়েছে তা থেকে তোমরা আহার করো।’ (সূরা: আনয়াম, আয়াত: ১১৮)।

হাদিসে এসেছে- রাসূলুল্লাহ (সা.) দুটি শিংওয়ালা ভেড়া জবাই করলেন, তখন ‘বিসমিল্লাহ’ ও আল্লাহু আকবার’ বললেন। (দারিমি, আসসুনান : ১৯৮৮)।

‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠের পর— اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ ‘হে আল্লাহ এটা তোমার তরফ থেকে তোমারই জন্য।’ বলা যেতে পারে। যার পক্ষ থেকে কোরবানি করা হচ্ছে তার নাম উল্লেখ করে দুয়া করা জায়েয আছে। এভাবে বলা যেতে পারে, ‘হে আল্লাহ তুমি অমুকের পক্ষ থেকে কবুল করে নাও।’

মূলত কোরবানি কেবল নিজের তরফ থেকে হলে বলবে, ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা ইন্না হাযা মিনকা ওয়ালাকা, আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি।’ নিজের এবং পরিবারের তরফ থেকে হলে বলবে, ‘….তাকাবাল্লাহ মিন্নি ওয়ামিন আহলি বাইতি।’ অপরের নামে হলে বলবে, ‘তাকাব্বাল মিন…(এখানে যার তরফ থেকে কোরবানি তার নাম নেবে)’। (আলবানি, মানাসিকুল হাজ্জ, পৃ. ৩)।

৫. রক্ত প্রবাহিত হওয়া জরুরি। আর তা দুই শাহরগ (কণ্ঠনালির দু’পাশে দুটি মোটা আকারের শিরা) কাটলে অধিকরূপে সম্ভর হয়। রক্ত প্রবাহিত ও শুদ্ধ জবেহ হওয়ার জন্য চারটি অঙ্গ কাটা জরুরি- শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং পার্শ্বস্থ দুটি মোটা শিরা।

৬. প্রাণ ত্যাগ করার পূর্বে পশুর অন্য কোনো অঙ্গ কেটে কষ্ট দেয়া হারাম। যেমন ঘাড় মটকানো, পায়ের শিরা কাটা, চামড়া ছাড়ানো ইত্যাদি জান যাওয়ার আগে বৈধ নয়। একইভাবে, দেহ আড়ষ্ট হয়ে এলে চামড়া ছাড়াতে শুরু করার পর যদি পুনরায় লাফিয়ে ওঠে, তাহলে আরো কিছুক্ষণ প্রাণ ত্যাগ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যেহেতু পশুকে কষ্ট দেয়া বৈধ নয়। পশু পালিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও ঘাড় মটকানো যাবে না। বরং তার বদলে কিছুক্ষণ চেপে ধরে রাখা যায়।

যবেহ করার সময় পশুর মাথা যাতে বিচ্ছিন্ন না হয় খেয়াল করা উচিত। তা সত্ত্বেও যদি কেটে বিচ্ছিন্ন হয়েই যায়, তাহলে তা হালাল হওয়ার ব্যাপাবে কোনো সন্দেহ নেই।

যবাই ছেড়ে দেয়ার পর (অসম্পূর্ণ হওয়ার ফলে) কোনো পশু উঠে পালিয়ে গেলে তাকে ধরে পুনরায় জবাই করা যায়। নইলে কিছু পরেই সে এমনিতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।

যবেহ করার জন্য পবিত্রতা বা জবাইকারীকে পুরুষ হওয়া শর্ত নয়। মাথায় টুপি রাখা বা মাথা ঢাকাও বিধিবদ্ধ নয়। তবে ঈমানের পবিত্রতা জরুরি। কাফির, মুশরিক ও বেনামাজির হাতের জবাই শুদ্ধ নয়।

উল্লেখ্য, যবেহকৃত পশুর রক্ত হারাম। অতএব তা কোনো ফল লাভের উদ্দেশ পায়ে মাখা, দেওয়ালে ছাপ দেয়া বা তা নিয়ে ছুড়াছুড়ি করে খেলা করা বৈধ নয়।

Facebook Comments