ওদের গল্প শুনুন

74

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঢাকার রাতের গল্পগুলো আলাদা। প্রতিটি গল্পতে প্রাণের সঞ্চারণ আছে; আছে হাসি-কান্না মেশানো বাস্তবতার সুনশান নীরবতা। এই নীরবতার পেছনের গল্পগুলো একেবারে জীবন থেকে নেওয়া। গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষগুলোর ভালো লাগা আর সুখ-দুঃখের অনুভূতি উঠে এসেছে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণখান জোন উত্তরা বিভাগ ডিএমপি) হাফিজুর রহমান রিয়েল-এর চোখে। রাত্রিকালীন ডিউটি তদারকির ফাঁকে-ফাঁকে এসব মানুষের চলমান কাহন শুনাচ্ছেন তিনি।

রাত শেষ হয়ে আসছে। ভোর সাড়ে চারটা তখন। গাড়ি থামল উত্তরার আমির কম্পেলেক্সের সামনে। ওখানে দাঁড়িয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার একজন অফিসার ও দুজন কনস্টেবল। ওদেরকে চেক দিয়ে গাড়িতে উঠতে যাওয়ার আগেই চোখ আটকে গেল চারজন লোকের দিকে।

উনারা সবাই রিকশাচালক। দুজন ঘুমিয়ে। দুজন জাগা। হাতে বিড়ি জ্বলছে একজনের। সুনীল নাম ওর। রনজিত নামের আর একজন গুলের কৌটা বের করে ঠোঁটের নীচে গুল দিচ্ছে। আস্তে আস্তে পাশে যাই।

পুলিশ ভেবে একটু ইতস্তত বোধ করলেও একটু পরেই বরফ গলতে শুরু করে। আলাপ জমে উঠে। তিস্তা বিধৌত লালমনিরহাট আর কুড়িগ্রামের রাজারহাটে বাড়ি এদের। মাত্র দু’মাস হলো ঢাকায় এসেছে। বাউনিয়ায় একটা মেসে থাকে সবাই মিলে।

‘সবাইকে ছেড়ে এসে ঢাকায় থাকতে কেমন লাগছে’ -‘ক্যাম্বা করি কই কনতো? হামরা গরীব মাইনসি, খারাপ নাগলে কিছু করার আছে নাকি কন দেখি, হামরাগুলার ভালো নাগা আর খারাপ নাগা থাকপার নাই’ গুলটা ঠোটের নীচে আংগুল দিয়ে ঠিক করতে করতে জবাব দেয় সুনীল।

হুট করে ঠাস ঠাস শব্দে ডানে-বামে তাকাই। বাচ্চু মিয়ার ঘুম ভাংলো মাত্র। একসাথে তিনটে মশা পায়ে বসেছিল। রক্ত খেয়েছে বেশ। বাচ্চু মিয়ার হাতেও রক্ত। ‘কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে পারতেন’ -‘হামরাগুলার কয়েল লাগেনা এইলা বন্ধু মশা, কামড়ালে কিচ্ছু হয়না’ আমার প্রশ্নের উত্তরে ঘাড় ঘুড়িয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে এভাবেই বললেন বাচ্চু মিয়া।

অল্পক্ষণ পরেই মানিকের দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকায় বাচ্চু। ‘তুই আর ঘুমিবা দিলুনা মোক, কী একটা গান পাইছিস ওইটাই খালি রাত-দিন শুনেছিস, বন্ধ করতো ওইটা।’

মানিকের দিকে তাকাই। বুঝলাম কিছুটা লজ্জা পেয়েছে। বয়স উনিশ-কুড়ির বেশী না। ওর পকেটে থাকা মোবাইল থেকে গান ভেসে আসছে-‘সোনা বন্ধুরে কোন দোষেতে যাইবা ছাড়িয়া, আমি কাইন্দা কাইন্দা হইলাম সারা কেবল তোমার লাগিয়া’’। এটা আব্বাসউদ্দিনের গলা তাইনা? মুচকি হেসে মাথা নেড়ে সায় দেয় মানিক। কেউ কী আসলে ছেড়ে গেছে? জানতে চাই মানিকের কাছে।

মুহূর্তেই মন ভারি হয়ে উঠে ওর। বুঝতে চেষ্টা করি তার কষ্টটা। ‘এগলা শুনলে মন খারাপ হবে আমার, হবে কষ্ট, থাক এসব বলবোনা আমি’, একরাশ অভিমান নিয়েই বলে উঠে মানিক। একটু পরেই পাশ থেকে বাচ্চু মিয়া মানিকের উদ্দেশ্যে বলে উঠে-‘যে গেছে চলে, কী হবে আর বলে।’

বাচ্চুর এমন কথা শুনে ওরা সবাই হোহো করে হাসতে থাকে। আমিও বিদায় নেয়। গাড়ির গতি বাড়তে থাকে। পেছনে ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি আমার যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে মানিক। ওর কোমল মায়াবী মুখটা নাড়া দেয় খুব। ওর মোবাইল থেকে ভেসে আসা গানটা মাথায় দোল খেতে থাকে -‘সোনা বন্ধুরে কোন দোষেতে যাইবা ছাড়িয়া।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments