একজন জাতীয়তাবাদীর গল্প

95

সঞ্জিত চন্দ্র পন্ডিত:

“বুকে সাহস রেখে এগিয়ে যাও- বাংলাদেশ দেখবে” জাতীয়তাবোধ এ নিমজ্জিত চুরাশি বছরের দেহধারণকারী তরুণের তারুণ্য দীপ্ত এই আহ্বান তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্নের এক উচ্ছল বহিঃপ্রকাশ। না তাঁর এই স্বপ্নের বাস্তবতা ঘোলাটে নয়নের সামনে প্রকাশিত হয়নি বটে, কিন্তু তিনি ঠিকই দেখতে পেয়েছিলেন ভবিষ্যৎ ভবিতব্য।

নিজেকে তিনি বাঁচাতে পারতেন খুব সহজেই কিন্তু তিনি বলেছিলেন আমাকে যদি পাকিস্তানিরা না পায় তাহলে প্রতিবেশীদের উপর নারকীয় অত্যাচার নেমে আসবে। তাই তিনি নিজেকে প্রতিবেশীর ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৯ শে মার্চ বর্বর পাকিস্তানী বাহীনীর নৃসংসতার কাছে ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্টে চিরতরে নিরব হয়ে যান।

স্বাধীনতা নামক বৃক্ষটি পরিপূষ্ট হতে হতে ১৯৭১ সালে শাখা প্রশাখা নিয়ে বিস্তার লাভ করেছিল। ফলে আমরা পেয়েছিলাম পরিপূর্ণ স্বাধীনতা। স্বাধীনতা বৃক্ষের এই বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নিতান্তই সাদামাটাভাবে। পাকিস্তান গণপরিষদে কোনরুপ দলীয় আলোচনা ছাড়াই আপাত নির্দোষ একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন ।

তিনি বলেছিলেন, ইংরেজী ও উর্দূর পাশিাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের দাপ্তরিক ভাষা করা হোক । প্রস্তাবে প্রথমে তিনি বলেছিলেন সরকারি কাগজপত্রে – মুদ্রায়, নোটে , মনি অর্ডার ফরমে, ডাকটিকেটে বাংলা ভাষা অবহেলিত তাতে জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে; তারপর বলেছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হিসেবে আমি মনে করি বাংলা

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত । কিন্তু তার এই নির্দোষ প্রস্তাবের সমর্থনে কংগ্রেস দলীয় সদস্যগণ ব্যতিত সেদিন আর কেউ এগিয়ে আসেনি। খাজা নাজিমুদ্দিন গং এটাকে সাম্প্রদায়িক প্রস্তাব হিসেবে গণ্য করে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন ।

জাতীয়তাবাদী এই সাহসী চিরতরুণ নেতা বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার রামরাইলে ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন । তাঁর পিতার নাম ছিল জগবন্ধু দত্ত যিনি ছিলেন মুন্সেপ আদালতের সেরেস্তাদার।

শিক্ষা জীবনের হাতে খড়ি হয় পিতার কর্মস্থল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবাতে । অত:পর তিনি চলে আসেন নবীনগর হাইস্কুলে এবং তিনি এখান থেকেই ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলেজ জী বনে তিনি কলকতার রিপন কলেজ ও ঢাকার জগন্নাথ কলেজে পড়াশুনা করেন এবং কুমিল্লা কলেজ থেকে ১৯০৫ সালে এফ এ পাশ করেন। এরপর ১৯০৬ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত কলকাতার রিপন কলেজে ছিলেন এবং এখান থেকেই ১৯০৮ সালে গ্রাজুয়েশন সমাপ্ত করেন ।পরবর্তীতে ১৯১০ সালে তিনি আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।

তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাল্য বয়সে বিয়ের ঘটনা হারহামেশাই ঘটত । বাল্য বিবাহের ঘোরবিরোধী এই নেতা নিতান্ত আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ।তাঁর শশুর ছিলেন অবস্থাপন্ন ব্যাক্তি এবং তিনি পাঠ্য পুস্তক কেনায় তাকে সহযোগিতা করছিলেন বলে জানা যায়।

কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হয়ে। কুমিল্লা বাংগোড়া স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন ১৯১০ সালে । অতঃপর ১৯১১ সাল হতে পিতার হাত ধরে চলে আসেন আইন পেশায়। রাজনৈতিক কারনে দুইএকবার ছন্দপতন ব্যতিত জীবনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি আইন পেশার সাথে জড়িত ছিলেন।

তিনি স্থানীয় নানা মূখী সমাজ সেবা মূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ১৯০৭ সালে তিনি ত্রিপুরার অন্ত:পুরবাসীর মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য “হিতসাধিনি সভার” সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত হন। ১৯১৫ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় গণমানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি ১৯২১ সালে “মুক্তি সংঘ ” নামক সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার মূল লক্ষ্য ছিল বর্ণবাদ দূরীকরণ। ১৯২৩ সালে কুমিল্লায় “অভয় আশ্রম ” প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর সাথে যুক্ত হন। ১৯৩৮ সালে প্রজাসত্ব আইন সংশোধন ও মানি লেন্ডার এক্ট পাস ও কার্যকরী করার জন্য আইনগত সহায়তার জন্য কংগ্রেস দলীয় মুখপাত্র হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন এবং মহাত্মা গান্ধীর উৎসাহে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ত্রিপুরা জেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে দূর্গা মানুষের জন্য কাজ করেছিলেন।

ত্রিপুরার এক বর্ধিত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করার পরেও জমিদারি প্রথাকে তিনি মনে মনে প্রচণ্ড ঘৃনা করতেন । তাইতো তিনি এই পরিচয় কখনও দিতেন না । জনগণকে সাথে নিয়ে অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা করে গেছেন সারা জীবন ।

মহান এই নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ছিল কন্টকময় । ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে। পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে দেশকে মুক্ত করতে হবে এই মনোভাব তিনি সবসময় পোষন করতেন । ১৯০৬ সালে তিনি কলকাতায় কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক দলভূক্ত হন। তার মতে হিত সাধিনি সভার সভাপতি আব্দুল রসুলেই ছিলেন তাাঁর সত্যকারের রাজনৈতিক গুরু।

স্বদেশী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ১৯০৮-০৯ সালের বহরমপুর সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবংচরমপন্থি নেতা বিপিন চন্দ্রের নেতৃত্বে তিনি বেনউড চেয়ার প্রতিস্থাপনের বিরোধিতা করেন।

ইংরেজ শাসনের শৃংঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য তিনি সর্বদা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন । তথাপি তিনি বিশ্বাস করতেন নিয়মতানিত্রক আন্দোলনে স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনি ১৯১৯ সালের ময়মনসিংহ অঞ্চলের কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯২১ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এর আহবানে সাড়া দিয়ে স্বেছ্ছাসেবী দলের প্রধান হিসেবে ব্রাহ্মনবাড়ীয়া মহকুমায় গ্রামাঞ্চলে সক্রিয় কর্মতৎপরতা চালান।

১৯২৯ সালে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনের সিন্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সর্বভারতীয় আইন অমান্য করায় বৃটিশ প্রশাসন কর্তৃক গ্রেফতার হন এবং প্রহসনের বিচারে তিনি ০৩ মাসের কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে তাকে শর্তাধীনে মুক্তি প্রদান করা হয় ১৯৩১ সালে । কিন্তু শর্ত ভঙ্গ করে তিনি বারবার বক্তব্য রাখায় ইংরেজরা তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে এবং এক বছরের জন্য কারাবরণ করেন।

১৯৪০ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস দল দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেলে একাংশের ডেপুটি লিডার হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মহাত্না গান্ধীর নেতৃত্বে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের জন্য ব্রাহ্মনবাড়ীয়া ডাকঘরের সামনে যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য প্রদানের সময় তিনি গ্রেফতার হন। ০৯ মাস কারাভোগের পর তিনি মুক্ত হন এবং ১৯৪২ সালে আবার কারাভোগ করেন।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় তিনি জন্মস্থানের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার জন্য জন্মস্থান ছেড়ে যাননি । তার জন্য হয়তো অনেক বড় পদ অপেক্ষা করছিলো তথাপি তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ এর ঘোষনায় তিনি মনে প্রাণে নিজেকে একজন পাকিস্তানী হিসেবে দেশ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্ট সরকার বাতিল করে গভর্নর নিযুক্ত হলে তিনি আইন সভায় একটি মুলতবী প্রস্তাব রাখেন এবং দীর্ঘ আড়াই ঘন্টার বক্তব্যে আদমজীর ঘটনা একটা অজুহাত ছিল মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন এবং বলেছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের অপছন্দের জন্যই যুক্ত ফ্রন্ট সরকারের পরিনতির কথা।

তিনি ১৯৫৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নের্তৃত্বে স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন। আজন্ম মাটি ও মানুষের সাথে মেশা এই নেতা মন্ত্রী হয়েও গণমানুষ থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হননি । তাইতো তিনি অতি অল্প সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর নতুন ভবন নির্মান,নার্সস কোয়ার্টার স্থাপন, চট্রগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ স্থাপন,স্থানীয়ভাবে টিকা বীজ উৎপাদনসহ নানামূখী উন্নয়ন কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

১৯৫৮ সালে আইয়ুবি শাসন শুরু হওয়ার সাথে সাথে আবার ফিরে গিয়েছিলেন কুমিল্লায় গণমানুষের কাতারে , যুক্ত হয়েছিলেন আইন পেশায় । ১৯৬৫ সালে তিনি বার এসাসিয়েসনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছিলেন এবং নির্বাচনের প্রচারকালে তিনি আবার কারাবরণ করেন।

জাতীয়তাবাদী এই নেতা ভাষাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন নামক সলতেয় প্রথম যে অগ্নি প্রজ্বলন করেছিলেন ১৯৪৮ সালে তার ধারাবাহিকতায় এসেছে আমাদের মহান স্বাধীনতা । তিনি স্বাধীনতার উচ্ছাস উদযাপন করতে পারেন নাই তবে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে বিলিয়ে দিয়েছেন দেশ মাতৃকার জন্য । মহান শহীদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত এর মতো প্রজ্ঞাবান সৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বার বার জন্মগ্রহণ করুক এই মাতৃকায়।

লেখক:
সঞ্জিত চন্দ্র পন্ডিত
ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল
কুমিল্লা বিভাগ, কুমিল্লা-৩৫০০

Facebook Comments