আশুরার ঐতিহাসিক তাৎপর্য

41

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম

হিজরি সালের প্রথম মাস মহররমের দশম দিবসকে আশুরা বলা হয়। পবিত্র আশুরা মুসলিম ঐতিহ্যে অনেক বরকতপূর্ণ এবং বিভিন্নভাবে অবিস্মরণীয়। ইসলামপূর্ব যুগেও এই দিনকে অনেক মর্যাদাপূর্ণভাবে পালন করা হতো। এই দিনে শুধু কারবালা প্রান্তরের হৃদয়বিদারক উপাখ্যান এবং নবীদৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত বরণের ঘটনাই ঘটেনি, বরং সৃষ্টির সূচনা থেকে এই দিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

সাহাবায়ে কেরাম একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন, আশুরা এত বেশি তাৎপর্যময় হওয়ার কারণ কী? উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা আশুরার দিন নভোমন্ডল সৃষ্টি করেছেন।

লওহ-কলম, নদ-নদী সৃষ্টি করেছেন। আদমকে (আ.) সৃষ্টি করেছেন, তাকে বেহেশতে প্রবেশ করিয়েছিলেন এবং এই দিনেই তার দোয়া কবুল হয়েছিল। ১০ই মহররম আশুরায় সংঘটিত কিছু ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যময় ঘটনা পবিত্র আশুরার দিনে আল্লাহ তায়ালা সাগর, পাহাড়, প্রাণীকুল, আসমান-জমিন ও লওহ-কলম সৃষ্টি করেন। আল্লাহ তায়ালা আরশে আজিমে সমাসীন হন।

আল্লাহ তায়ালা আদি পিতা হজরত আদমকে (আ.) তার খলিফা নিযুক্ত করেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।
আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর ভুলের কারণে পৃথিবীতে নির্বাসনের পর আরাফার ময়দানে তাদের দুজনের পরিচয় করান এবং এই দিনেই দীর্ঘদিন ক্ষমা প্রার্থনা শেষে দুজনের তাওবা কবুল করেন। পৃথিবীর প্রথম হত্যাকান্ড হাবিল কাবিলের ঘটনা সংঘটিত হয়।

হজরত নুহ (আ.) সদলবলে মহা প্লাবন শেষে জুদি পাহাড়ে অবতরণ করে পৃথিবীকে নতুন করে সাজিয়ে তোলেন। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইবরাহিমকে (আ.) সৃষ্টি করেন। এই দিনে হজরত ইবরাহিম (আ.) ক্ষমতাশালী মূর্তিপূজারি নমরুদের অগ্নিকান্ড থেকে উদ্ধার হন। হজরত আইয়ুব (আ.) কুষ্ঠরোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেন। হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান।

আল্লাহ তায়ালা হজরত ইদরিসকে (আ.) জান্নাত থেকে দুনিয়ায় পাঠানোর পর অপরাধের জন্য কান্নাকাটি করলে আবার তাকে জান্নাতে ফেরত নেন। হজরত দাউদ (আ.)-এর গুনাহ মাফ হয়। মারিয়াম (আ.)-এর গর্ভ থেকে হজরত ঈসা (আ.)-এর পৃথিবীতে আগমন ঘটে। হজরত সোলায়মান (আ.) হাতের আংটি হারিয়ে সাময়িকভাবে রাজ্যহারা হলে এই দিনেই আল্লাহ তার রাজ্য ফিরিয়ে দেন।

হজরত ইউসুফ (আ.) তার পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর সঙ্গে সুদীর্ঘ ৪০ বছর পর এই দিনে সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং হজরত ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। হজরত আসিয়া শিশুপুত্র মুসাকে (আ.) এই দিনই ফেরত পান। হজরত মুসা (আ.) সিনাই পাহাড়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওরাত লাভ করেন। মুসা (আ.) তৎকালীন মিসরের বাদশাহ ফেরাউনের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লে এই দিনে তিনি বনি ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে নীল নদ পার হয়ে যান, আর নদীর মাঝপথে পানি চাপা পড়ে ফেরাউনের সলিল সমাধি ঘটে। হজরত ঈসাকে (আ.) আল্লাহ তায়ালা নিজ করুণায় এই দিনে আসমানে তুলে নেন। এই দিনই রহমতস্বরূপ আসমান থেকে প্রথম বৃষ্টি নামে।

এই দিনে কারবালা প্রান্তরে হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ইসলামের ইতিহাসের মর্মান্তিক ঘটটনা সংঘটিত হয়।
সর্বশেষ এই ১০ মহররমেই জুমার দিন কেয়ামত সংঘটিত হবে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
(বুখারি : ১৯০০, মুসলিম : ২৬৫৩, আল বিদায়া ওয়ান
নিহায়া : ১/১৩২, আল কামেল ফিত তারিখ : ১/১২২
উসদুল গাবাহ : ১/২১)

Facebook Comments