আমি বেঁচে না থাকলে ওরা কেমনে চলবে?

67

আইসিইউতে থেকেও পরিবার সন্তানের কথা ভাবছেন হতভাগা প্রবাসী, যেখানে নিজের জীবন বিপন্ন সেখানে সেই হতভাগা বলছেন দেশে যাওয়া আমার খুবই দরকার। আমি বেঁচে না থাকলে ওরা কিভাবে চলবে! কথা গুলো ২৩ বৎসর ধরে সৌদিআরবে বসবাসরত প্রবাসী জসিম উদ্দিনের। গত ৮ দিন ধরে সৌদি জার্মান হাসপাতালে আইসিইউতে আছেন, এর মধ্যে অপারেশন হয়েছে।

চেহারা, মাথার চুল, এই বয়সেও অনেক স্মার্ট। এমন মানুষকে আমার নিজ গ্রামে দেখিনি। তিনিও আমাকে কোনদিন দেখেনি, দেখলেও ছোট বয়সে দেখেছেন,এখন মনে না থাকারই কথা।

আজকের দিন সহ ৪ দিন আমি ওনাকে দেখতে গিয়েছিলাম, তার মধ্যে দুইদিন তিনি আমাকে দেখেছে, বাকি দুইদিন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন।

প্রথম দিন আমি পরিচয় দিয়েছি, আমি মোবারক। পুরোপুরি চিনতে পেরেছিলো কিনা জানা নেই।আজ আমার ডিউটি শেষ হয় স্থানীয় সময় রাত ৯ টায়। সরাসরি চলে গেলাম হাসপাতালে, যেহেতু তিনি আইসিইউতে আছেন। সাক্ষাৎ’র কিছু নিয়ম আছে, বিকেল ৩ টা থেকে ৪ টা পর্যন্ত সাক্ষাৎ সময়। সিকিউরিটি গার্ডকে গিয়ে বললাম, বিস্তারিত। দেখা করা খুবই দরকার। সে আমাকে শর্ত দিয়েছে এক প্যাকেট সিগারেট এনে দেয়, আমি তোকে ঢুকতে দিবো। শর্ত মেনে তার দেওয়া টাকায় সিগারেট এনে দিয়ে ১০ মিনিট সময়ের জন্য ভিতরে ঢুকতে দেয়।

ভিতরে ঢুকে ওনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম। পরে আমি মাথায় হাত দিলাম কিছুক্ষণ পর চোখ মেলে দেখে আমি দাড়িয়ে আছি।

কখন এসেছো, কি নাম তোমার জানতে চাইলো, উত্তর দিলাম। এ অবস্থাতেও পরিবারের কথা ভাবছেন, তুমি বলি দিও ইনশাআল্লাহ আমি ভালো হয়ে যাবো। আমি না থাকলে তারা কেমনে চলবে! আমি আমার নিজেকে কোনমতে কন্ট্রোল করে চোখের পানি পড়ার আগে বিদায় নিলাম ।

কথাগুলো এভাবেই তুলে ধরছেন সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থানরত সাংবাদিক মোবারক হোসেন ভুইয়া। অসুস্থ জসীম উদ্দিন তারই গ্রামের লোক।কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায়।
এভাবেই প্রিয়জনের প্রয়োজনে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেই প্রবাসীরা।হাসপাতালের বেডে থেকেও ভাবেন আপনজনের কথা।

একজন প্রবাসী। নিজের জীবনের সোনালী সময়টা পাড় করেন প্রবাসে।দেশের জন্য কুড়িয়ে পাঠান কাঁচা সোনা।সমৃদ্ধ রেমিটেন্সে দেখে সরকার গর্ব করেন।বাহাবা দেন,অথচ প্রবাসী তার জীবনের মূল্যবান ২০-২৫ বছর প্রবাসে কাটিয়েও চিন্তা করতে হয় দেশে গিয়ে কিভাবে চলবেন?হতাশায় ভোগেন কিভাবে চালাবেন সন্তানের ভরনপোষন।কারন তার ২৫বছরের চাকুরী জীবনের যে কোন পেনশন ভাতা নেই।

আমাদের কথা:
দেশের শিক্ষিত-অর্ধ শিক্ষিত এককোটিরও বেশী জনশক্তি ভিনদেশে কাজ করছেন।দেশে থেকে সরকারের বোঝা না হয়ে নিজে উপার্জন করছেন। কেউ সল্প বেতনে কেউবা উচ্ছ বেতনের চাকুরী করেন।এদের অনেকের টাকাই চলে যায় একান্নবতি পরিবারের খুটি মজবুত করতে।প্রবাসীর পাঠানো টাকায় বোনের বিয়ে,ভাইয়ের উচ্ছ শিক্ষায় ব্যায় হয়।একসময় পরিবার ভিন্ন হয়ে যায় প্রবাসীর হাতে আর জমানো কিছুই থাকেনা।কারো আবার গল্প ভিন্নও হয়।
প্রতিটা প্রবাসীকে যদি বাধ্যতামুলক জীবন বীমার আওতায় আনা যায় প্রবাসীদের শেষ সময়টায় অন্তত হতাশায় ভোগতে হবেনা।আশা করি প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রনালয় এবিষয়টা ভেবে দেখবেন।

শাহাদাত হুসাইন
-সম্পাদক,প্রবাসের গল্প সিরিজ
সৌদিআরব প্রবাসী।
Hossain555@yahoo.com

Facebook Comments